
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা ঘিরে উত্তেজনা নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করার পর সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা ‘অপারেশন নাসর-২’ নামে ১৫ দিনব্যাপী পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ব্যবহৃত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই ছিল এই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
আইআরজিসির দাবি, অভিযানে অন্তত আটটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘাঁটির ২০টি হ্যাঙ্গার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে।
সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি
আইআরজিসির তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের দাবি, ধ্বংস হয়েছে ১১টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার, চারটি ভারী সামরিক হেলিকপ্টার, একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, একটি পি-৮ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান এবং একটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার সামরিক পরিবহন বিমান।
এছাড়া ১৭টি নজরদারি ও অপারেশনাল ড্রোন এবং আটটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান ধ্বংসের দাবিও করেছে বাহিনীটি।
রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় সাতটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ছয়টি প্যাট্রিয়ট রাডার ইউনিট, আটটি আগাম সতর্কীকরণ রাডার, সাতটি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র রাডার, পাঁচটি দূরপাল্লার রাডার স্থাপনা, পাঁচটি এফপিএস ও এফপিএস-১১৭ রাডার, তিনটি আকাশ ও সামুদ্রিক নজরদারি রাডার এবং তিনটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তি কেন্দ্রেও ক্ষয়ক্ষতির দাবি
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হামলায় ছয়টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের হ্যাঙ্গার, পাঁচটি যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার, চারটি সুরক্ষিত বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, একটি এফ-১৫ প্রস্তুতি হ্যাঙ্গার, আটটি ড্রোনসহ একটি ড্রোন হ্যাঙ্গার, একটি পি-৮ পোসেইডন বিমানের হ্যাঙ্গার এবং ছয়টি বিমান পার্কিং ও ফ্লাইট র্যাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী, ১৭টি অস্ত্রভাণ্ডার, বিমান যন্ত্রাংশ ও নৌ সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার, ১২টি জ্বালানি ট্যাংক, একটি জ্বালানি ডক এবং একটি বিমানবাহী রণতরির জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্মও হামলার শিকার হয়েছে।
এছাড়া চারটি হিমার্স রকেট লঞ্চার, চারটি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ছয়টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার, ছয়টি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, দুটি সিগন্যাল গোয়েন্দা যোগাযোগ কেন্দ্র, একটি ডেটা ইন্টেলিজেন্স হাব, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসেসিং সেন্টার, একটি অ্যামাজন ডেটা নোড এবং একটি চালকবিহীন নৌযান সংরক্ষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি।
‘২০০-এর বেশি মার্কিন সেনা নিহত’
মার্কিন প্রশাসন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতাহতের তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে হোসেইন মোহেবি দাবি করেন, ‘অপারেশন নাসর-২’ চলাকালে ২০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা আরও বেশি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মার্কিন ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানান, যাতে ঘটনাগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়।
তবে আইআরজিসির উত্থাপিত এসব দাবি কিংবা হতাহতের তথ্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।