
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে বহু মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’ (এপিডিআর) বিএসএফ-এর এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর প্রতিবাদে আগামী ১১ জুন মালদা শহরে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
আজ রোববার (৭ জুন) সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুতর অভিযোগ ও কর্মসূচির কথা জানানো হয়।
এপিডিআর তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেই ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’ (চিহ্নিতকরণ, বহিষ্কার এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলা) বা ‘থ্রি-ডি’ নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার গঠনের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফ-এর হাতে জমি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তথাকথিত বাংলাদেশিদের আটকে রাখতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ডিটেনশন ক্যাম্প চালুর উদ্যোগ নেন। এর পরপরই সীমান্ত এলাকাগুলোতে কথিত বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, বিএসএফ ও রাজ্য সরকারের এই যৌথ অনমনীয় অবস্থানের কারণে বর্তমানে বহু সাধারণ মানুষ দুই দেশের সীমান্ত মধ্যবর্তী এলাকায় চরম মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
পরিস্থিতিকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে এপিডিআর-এর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বিএসএফ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে, বিশেষত নারী ও শিশুদের, বিভিন্ন জেলার সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জোর করে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ভারতের তরফ থেকে পুশ ইন-এর চেষ্টা করা হলেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) যথাযথ নথিপত্র ছাড়া কাউকে তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।
এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একাধিক জিরো পয়েন্ট বা ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ নারী ও নিষ্পাপ শিশুরা দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে আটকে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এপিডিআর জানায়, অবরুদ্ধ এই মানুষদের মধ্যে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুও রয়েছে, যারা তীব্র রোদ, আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে খাদ্য ও পানীয় জলের চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে, যা সীমান্তে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনড় অবস্থানের বিবরণ দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বিএসএফ বলছে, ওরা বাংলাদেশি, তাই বিএসএফের কোনো দায়িত্ব থাকতে পারে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবি বলছে, ওরা যে বাংলাদেশি, তার কোনো প্রমাণ নেই। বিজিবির মতে, ওরা ভারতীয়। ফলে তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। ফলে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর বন্দুকের সামনে খাবার ও পানীয় জলহীন এক ভয়ংকর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বেশ কিছু মানুষ।”
সীমান্তের এই অমানবিক সংকটের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিকে দায়ী করে এপিডিআর বলেছে, “আমরা মনে করি, ভারতের ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট (থ্রি ডি) নীতিটাই অসাংবিধানিক, বেআইনি। সংবিধানের ২১ এবং ১৪ নম্বর ধারার বিরোধী। এই নীতিই বর্তমান সংকটের উৎস।” উল্লেখ্য, ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ দেশের অভ্যন্তরে থাকা যেকোনো ব্যক্তির আইনি সমতা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেকের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করে।
এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের ‘থ্রি ডি’ নীতি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এপিডিআর-এর সহসভাপতি রঞ্জিত শূর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “নো ম্যানস ল্যান্ড বা জিরো পয়েন্টে বিএসএফের ফেলে আসা সব মানুষকে অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। আমরা চাই, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সৃষ্টিকারী পুশ ব্যাক নীতি অবিলম্বে বাতিল করুক ভারত সরকার। আমরা এই বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।”