
বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর চরম জনরোষের মুখে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। চারদিকে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ এবং দলের কাউন্সিলরদের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় রাজ্য রাজনীতিতে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আজ রোববার (৭ জুন) এমন সংকটজনক প্রেক্ষাপটে কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) দলীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি হাইভোল্টেজ জরুরি বৈঠক করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা আকস্মিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
তৃণমূল ভবনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সমস্ত কাউন্সিলরের কাছে বৈঠক স্থগিতের আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা অবরুদ্ধ ও জনতার ক্ষোভের মুখে পড়ছেন। চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক কাউন্সিলরই এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কলকাতায় এসে বৈঠকে যোগ দিতে সরাসরি অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন।
এর বাইরে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এক বিস্ফোরক তথ্য দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ দলীয় কাউন্সিলরদের দেখলেই পচা ডিম কিংবা টমেটো ছুড়ে মারার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি ও বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতেই শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকটি বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
তবে প্রকাশ্য বৈঠক বাতিল হলেও কলকাতা পুরসভার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পর্দার আড়ালে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে তৃণমূল। নতুন মেয়র নির্বাচিত করার আইনি প্রক্রিয়াটি তারা চালু রেখেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার একদম গোপনে, শহরের বিভিন্ন সুরক্ষিত ও অজ্ঞাত স্থানে কাউন্সিলরদের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে ডেকে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে তাদের কাছ থেকে নতুন মেয়রের নাম প্রস্তাব করিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহের এক বিকল্প গোপন পরিকল্পনা সাজিয়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব।
এর আগে গত শুক্রবার কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগ করার পর শনিবার সন্ধ্যায় নতুন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেএমসি কর্তৃপক্ষকে একটি কড়া আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার কলকাতা পুরসভা আইনের ১১৭(১) ধারাটি উল্লেখ করে জানতে চেয়েছে— মেয়রের পদত্যাগের পর কেন তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে থাকা বর্তমান বোর্ডটিকে ভেঙে দেওয়া হবে না?
ইতিমধ্যেই ফিরহাদ হাকিমের পাশাপাশি মেয়র পরিষদের এক প্রভাবশালী সদস্য এবং বেশ কয়েকজন বোরো চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় পুরসভার বর্তমান বোর্ড গভীর প্রশাসনিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। এই জটিলতা নিয়ে কেএমসির চেয়ারপারসন মালা রায় এবং রাজ্য পৌর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মধ্যে তীব্র আইনি বাদানুবাদ ও পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক চলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, গত ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই কলকাতা পুর এলাকায় দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। দুর্নীতি, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি এবং নারীদের সাথে অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কলকাতা পুরসভার অন্তত আটজন তৃণমূল কাউন্সিলরকে ইতিমধ্যেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
রাজ্যের ভেতরের এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঝড়ের মাঝেই আগামীকাল সোমবার দিল্লিতে বিরোধী শিবিরের ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় প্রধানের সফরের আগেই অবশ্য শনিবার তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির উদ্দেশে কলকাতা ত্যাগ করেছেন।