
বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পেয়েছেন গবেষকেরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে শিশুদের শরীরে ক্ষতিকর ভারী ধাতু, বিশেষ করে সিসার উপস্থিতি নিয়ে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, দারিদ্র্য, অসচেতনতা ও পরিবেশদূষণের কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু জরিপের উপাত্তে দেখা গেছে, সিসার উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের অবস্থাই বেশি উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রতি ১০০ শিশুর প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসা বেশি
জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে অন্তত ৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা রয়েছে। অর্থাৎ, এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমায় বা তার ওপরে।
পরিবারের সম্পদের ভিত্তিতে শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সম্পদের শ্রেণি যত ওপরে উঠেছে, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে।
সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হারের ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের পরিবেশসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
শিশুর মস্তিষ্ক ও বিকাশে ক্ষতির আশঙ্কা
শিশুর রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এই ভারী ধাতু মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এসব ক্ষতির লক্ষণ সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ পায় না। বাইরে থেকে শিশুকে সুস্থ মনে হলেও তার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা।
ধনী পরিবারের শিশুদের ঝুঁকি কেন বেশি
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন বলেন, এসব পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক বেশি প্যাকেটজাত খাবার খেতে পারে। পাশাপাশি তাদের বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের আসবাব, দেয়ালের রং ও গৃহস্থালির সামগ্রী বেশি থাকে। এসব পণ্যে সিসার উপস্থিতি থাকলে সেগুলোর সংস্পর্শে শিশুদের শরীরে এই ধাতু প্রবেশ করতে পারে।
তবে গবেষণায় সিসার সম্ভাব্য উৎসগুলো আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব বা দেয়ালের রঙের কারণেই ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেওয়া যাচ্ছে না।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ বেশি হতে পারে।
তিনি জানান, এসব পরিবারের শিশুরা প্রায়ই আমদানি করা খেলনা পেয়ে থাকে। বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার সামগ্রীও থাকে। এ ছাড়া পোলট্রির মুরগির খাবারে সিসা থাকতে পারে। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের অনেক শিশু মুরগির মাংস বেশি খায়। এসব খাবারের মাধ্যমেও তাদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিভাগভেদেও সিসার মাত্রায় বড় ব্যবধান
শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। গত বছরের জরিপের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে, বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে।
এসব তথ্য থেকে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে, রাজশাহীতে এ হার সবচেয়ে কম।