
এক দশক আগে মাত্র ৫ কোটি ৮৫ লাখ রুপি দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তৃতীয় কিস্তিতে এসে সেই ‘দৃশ্যম’ ফ্র্যাঞ্চাইজি বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মুক্তির প্রথম দিনেই অজয় দেবগন অভিনীত ‘দৃশ্যম ৩: দ্য কনক্লুশন’ বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ৯৫ কোটি ১০ লাখ রুপি। এর মধ্যে ভারতের বাজারে নিট আয় ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি এবং মোট আয় ৮০ কোটি ১০ লাখ। বিদেশ থেকে এসেছে আরও ১৫ কোটি রুপি।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) গান্ধীজয়ন্তীর ছুটিতে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি অজয় দেবগনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় উদ্বোধনী আয় করেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত বড় হিন্দি সিনেমাগুলোর প্রথম দিনের ব্যবসার তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে এটি।
অজয়ের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে
ভারতে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি নিট আয় নিয়ে শুরু করেই অজয় দেবগনের আগের বড় ওপেনারগুলোর রেকর্ড ভেঙেছে ‘দৃশ্যম ৩’। এত দিন অভিনেতার সবচেয়ে বড় প্রথম দিনের আয় ছিল ২০২৪ সালের ‘সিংহাম এগেইন’-এর, যা উদ্বোধনী দিনে প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ রুপি আয় করেছিল।
অজয়ের অন্যান্য বড় ওপেনারের মধ্যে রয়েছে ‘সিংহাম রিটার্নস’ ৩২ কোটি ১০ লাখ, ‘গোলমাল এগেইন’ ৩০ কোটি ১৫ লাখ এবং ‘রেইড ২’ ১৯ কোটি ২৫ লাখ রুপি।
‘পাঠান’ ও ‘অ্যানিমেল’-এর ওপেনিংও পেছনে
অজয়ের ব্যক্তিগত রেকর্ড ছাড়িয়ে ‘দৃশ্যম ৩’ জায়গা করে নিয়েছে হিন্দি সিনেমার বড় উদ্বোধনী আয়ের তালিকাতেও। প্রথম দিনে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি নিট আয় করে এটি শাহরুখ খানের ‘পাঠান’ ও রণবীর কাপুরের ‘অ্যানিমেল’-এর উদ্বোধনী আয়কে ছাড়িয়ে গেছে।
‘পাঠান’ মুক্তির দিনে ৫৭ কোটি রুপি এবং ‘অ্যানিমেল’ প্রায় ৬৩ কোটি রুপি আয় করেছিল। তবে সর্বকালের সবচেয়ে বড় হিন্দি ওপেনারের তালিকায় এখনো ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমাগুলো এগিয়ে রয়েছে।
মুক্তির আগেই ‘দৃশ্যম ৩’-এর বক্স অফিস সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল অগ্রিম টিকিট বিক্রিতে। ২৭ সেপ্টেম্বর বুকিং শুরু হওয়ার পর মুক্তির আগেই অগ্রিম আয় ৫০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছিল।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছিল, অগ্রিম বুকিংয়ের গতি দেখে প্রথম দিনেই ৫০ কোটি রুপি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দর্শকের উপস্থিতি সেই প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়।
মুক্তির প্রথম দিনে ভারতে সিনেমাটির ১৫ হাজার ৭৫৯টির বেশি শো হয়েছে। সকালে আসন পূর্ণতার হার ছিল ৪৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দুপুরে তা বেড়ে ৭০ দশমিক ১৫ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৭৫ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং রাতে ৭৬ দশমিক ৪৬ শতাংশে পৌঁছায়। পুরো দিনের গড় আসন পূর্ণতার হার ছিল ৬৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
পূর্বাভাস ছিল ২৫–৩০ কোটি, আয় ৬৬ কোটি
মুক্তির আগে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের অনেকে ধারণা করেছিলেন, প্রথম দিনে ‘দৃশ্যম ৩’ ২৫ থেকে ৩০ কোটি রুপি আয় করতে পারে। কিন্তু অগ্রিম টিকিট বিক্রির গতি সেই হিসাব বদলে দেয়।
শেষ পর্যন্ত ভারতে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি নিট আয় করেছে সিনেমাটি, যা ওই পূর্বাভাসের দ্বিগুণেরও বেশি। ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যাশার তুলনায় অনেক শক্তিশালী সূচনা পেয়েছে ছবিটি।
সিনেমাটির এই সাফল্যের পেছনে অজয় দেবগনের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ‘দৃশ্যম’ ব্র্যান্ডের প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আগের দুই কিস্তির সাফল্য তৃতীয় ছবিকে ঘিরে মুক্তির আগেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল।
দশ বছরে ‘দৃশ্যম’ সিরিজের উত্থান
২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘দৃশ্যম’ উদ্বোধনী দিনে আয় করেছিল মাত্র ৫ কোটি ৮৫ লাখ রুপি। পরে দর্শকের মুখে মুখে সিনেমাটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং বিশ্বব্যাপী আয় দাঁড়ায় প্রায় ১১০ কোটি রুপি।
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দৃশ্যম ২’ প্রথম দিনে ১৫ কোটি ৩৮ লাখ রুপি আয় করে। সিনেমাটির শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আয় ছিল প্রায় ৩৪২ কোটি রুপি।
সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় কিস্তির প্রথম দিনের ভারতীয় নিট আয় ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি। অর্থাৎ প্রথম কিস্তির উদ্বোধনী আয়ের তুলনায় ১১ গুণেরও বেশি এবং দ্বিতীয় কিস্তির তুলনায় চার গুণের বেশি আয় করেছে সিনেমাটি।
বিজয় সালগাঁওকরের শেষ অধ্যায়
‘দৃশ্যম ৩’-এর মূল চরিত্রে অজয় দেবগন থাকলেও দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে বিজয় সালগাঁওকর। সাধারণ কেবল টিভি ব্যবসায়ী থেকে পরিবারের সদস্যদের রক্ষায় পুলিশের তদন্তের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া এই চরিত্র আগের দুই কিস্তিতেই দর্শকের মধ্যে আলাদা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিজয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার বুদ্ধি। সিনেমা দেখে তথ্য মনে রাখা, ঘটনাগুলো সাজিয়ে আলিবাই তৈরি করা এবং তদন্তকারীদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকার কৌশলই ‘দৃশ্যম’ সিরিজের অন্যতম আকর্ষণ।
তৃতীয় কিস্তিতে বিজয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে এসেছে এসপি রাজবীর সিং তোমর। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন জয়দীপ আহলাওয়াত। পুরোনো ঘটনার নিষ্পত্তিতে আবারও মরিয়া মীরা দেশমুখের চরিত্রে দেখা গেছে তাবুকে।
অজয় দেবগনের সঙ্গে আরও অভিনয় করেছেন শ্রিয়া শরণ, ইশিতা দত্ত, মৃণাল যাদব ও প্রকাশ রাজ। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন অভিষেক পাঠক।
সমালোচনায় প্রশংসার পাশাপাশি আপত্তিও
বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি ‘দৃশ্যম ৩’ নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও মোটের ওপর ইতিবাচক। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ অজয় দেবগন ও তাবুর অভিনয়ের প্রশংসা করেছে। তাদের মতে, বিজয় সালগাঁওকরের সংযত উপস্থিতি অজয় এবারও ধরে রাখতে পেরেছেন।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ সিনেমাটিকে ৫-এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫ রেটিং দিয়েছে। তাদের মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজির পরিচিত কাঠামো থেকে সিনেমাটি খুব বেশি বের হতে পারেনি, তবে উত্তেজনা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। নতুন পুলিশ কর্মকর্তা রাজবীরের আগমন গল্পে নতুন সংঘাত তৈরি করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘পিঙ্কভিলা’ বিশেষভাবে সিনেমার শেষ ৩০ মিনিট ও অজয়ের অভিনয়ের প্রশংসা করেছে। তবে আবহসংগীতের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং কিছু অংশ দীর্ঘায়িত করার সমালোচনাও করেছে তারা।
প্রথম দিনের ৯৫ কোটি ১০ লাখ রুপি বিশ্বব্যাপী আয় ‘দৃশ্যম ৩’-কে বড় সূচনা এনে দিয়েছে। এখন সিনেমাটির পরবর্তী ব্যবসা নির্ভর করবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের আয় এবং প্রথম সপ্তাহ শেষে মোট সংগ্রহ কতটা বাড়ে, তার ওপর।
২০১৫ সালে ৫ কোটি ৮৫ লাখ রুপি দিয়ে শুরু হওয়া ‘দৃশ্যম’ সিরিজের তৃতীয় কিস্তিতে প্রথম দিনের ভারতীয় নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপি। বিজয় সালগাঁওকরের গল্পের শেষ অধ্যায় শুরু হলেও ফ্র্যাঞ্চাইজিটির বক্স অফিস যাত্রার চূড়ান্ত হিসাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।