
পাবলিক পরীক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে নজিরবিহীন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ধাপে ধাপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এসব কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি থাকবে। পাশাপাশি দেশের যেকোনো কেন্দ্র তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শনের আওতায় আনা হবে।
আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষাকে সামনে রেখে এসব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা।
একসময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পরীক্ষায় নকল বন্ধে ‘হেলিকপ্টার মিশন’ চালু করেছিলেন। হঠাৎ করে বিভিন্ন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তিনি নকল নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। প্রায় ১৯ বছর পর পূর্ণ শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় এবারও সেই কঠোরতার ইঙ্গিত মিলছে, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। একই সঙ্গে বোর্ড চেয়ারম্যান বা তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রতিটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এ বছর থেকে অপ্রয়োজনীয় ‘ভেন্যু কেন্দ্র’ বাতিল করা হচ্ছে এবং পরীক্ষার্থীরা শুধুমাত্র তাদের লিখিত উত্তরের ভিত্তিতেই নম্বর পাবে, কোনো অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হবে না। এছাড়া চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের সময় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিষয় সংখ্যা কমানোর সম্ভাবনা যাচাইয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা হবে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত এবং প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত। যদি কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে কেবল পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আমরা বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেব। এবার থেকে খাতায় কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা অনুকম্পার সুযোগ থাকবে না। ছাত্রছাত্রীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে তারা। আমরা চাই মেধার প্রকৃত লড়াই হোক। কোনো ধরনের দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়ে অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা বন্ধ করতে চাই। আমরা আর কোনো অটোপাস চাই না।’
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরীক্ষা ঘিরে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও পাহাড়ি কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজর থাকবে। খাতা মূল্যায়নেও কোনো ধরনের অনানুষ্ঠানিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা ইতোমধ্যে চাওয়া হয়েছে এবং সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে লাইভ মনিটরিং চালু করা হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সন্দেহজনক কোনো কার্যক্রম শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে শিক্ষামন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট দল সরাসরি সেখানে পৌঁছাবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতি ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। প্রশ্ন মুদ্রণ থেকে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ স্কুলগুলোতে নকলের প্রবণতা তুলনামূলক কম হলেও মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এখনও এটি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের সহায়তায় নকলের ঘটনা ঘটে। এ বছর এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে এবং নকল প্রমাণিত হলে শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিবদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবারের বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হলো ভেন্যু কেন্দ্র প্রায় পুরোপুরি বাতিল করা। এতে তদারকি সহজ হবে এবং স্থানীয় প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমবে। ঢাকার কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি ও বিশেষ টহল দলও থাকবে।
পরীক্ষা চলাকালে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্যও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশব্যাপী পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হচ্ছে, যা সব শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সন্দেহভাজন চক্রের ওপর নজরদারি বাড়াবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এসএসসির প্রশ্নপত্র এরই মধ্যে জেলা পর্যায়ে চলে গেছে। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে এ বছর ২৯২টি ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল করেছি। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় শুধু নিকলি ও অষ্টগ্রামে দুটি ভেন্যু কেন্দ্র রাখা হয়েছে। নকল প্রতিরোধে মন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা করছি। সেখানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। আগামী ৪ ও ৫ এপ্রিল কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে বৈঠক। সেখানে নকল ও প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত পরীক্ষা গ্রহণে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। এ বছর যে স্কুলের পরীক্ষা, সেই স্কুলের কোনো শিক্ষক ওই কেন্দ্রে ঢুকতে পারবেন না।’
প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নগুলো প্রথমে ফয়েল প্যাকে ভরা হয়েছে। সেই ফয়েল প্যাক আবার সিকিউরিটি খামে ভরা হয়েছে। এই খামটি ওয়ান টাইম অর্থাৎ একবার খুললে তা আর লাগানো যায় না। আর ট্রেজারি থেকে প্রশ্ন নেবেন একজন ট্যাগ অফিসার। এরপর পরীক্ষা শুরুর ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে ট্যাগ অফিসার, পুলিশ অফিসার ও কেন্দ্র সচিবের স্বাক্ষরে প্রশ্নের খাম খোলা হবে। এবার যেহেতু ভেন্যু কেন্দ্র নেই, তাই মূল কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র ভেন্যু কেন্দ্রে নিতে হবে না। ফলে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগ নেই।’
সূত্র: কালের কণ্ঠ