
পাহাড়সম লোকসান আর খেলাপি ঋণের বৃত্তে আটকে পড়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি ও বহুজাতিক কয়েকটি ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত মুনাফা ধরে রাখলেও, মুষ্টিমেয় কিছু দুর্বল ও সংকটে থাকা ব্যাংকের অস্বাভাবিক লোকসানের কারণে পুরো খাত জুড়ে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছর শেষে সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যাংক খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ও মাসিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে তা সামান্য বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সাল থেকেই এই খাতে পতনের আভাস মিলতে শুরু করে, যখন মুনাফা কমে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর সর্বশেষ ২০২৫ সালের হিসাবে পুরো খাতই বিশাল লোকসানের গহ্বরে পতিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (একিউআর) করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এই চুলচেরা মূল্যায়নে কয়েকটি ব্যাংকের আসল কঙ্কালসার ও ভঙ্গুর আর্থিক চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত (মার্জার) করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের খতিয়ান বলছে, এর আগে ২০০৪ ও ২০০৬ সালেও ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি চলাকালীন পুরো খাত সামগ্রিক লোকসানের মুখে পড়েছিল। এছাড়া ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারির প্রঘাতে ব্যাংক খাতে ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা লোকসান গোছাতে হয়েছিল।
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংক মিলেই মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। তবে পুঁজিবাজারে ভালো অবস্থানে থাকা বেশ কয়েকটি লাভজনক দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের সন্তোষজনক মুনাফার কল্যাণে সামগ্রিক খাতের নিট লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক; প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৬৬...৩৮৬ কোটি টাকা। লোকসানের তালিকায় এরপরই রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (৩১ হাজার কোটি টাকা), এক্সিম ব্যাংক (২৮...৯০৮ কোটি টাকা), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (১৩...১৪৪ কোটি টাকা) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (৪...৬৮৫ কোটি টাকা)। এর বাইরেও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকসহ এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও গত বছর লোকসানের তালিকায় নাম লিখিয়েছে।
বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গত বছর ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে আয়ের দিক থেকে শীর্ষস্থান দখল করেছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ১...৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ১...০৯০ কোটি টাকা মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেশের ব্যাংকগুলোর দেওয়া মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশই বর্তমানে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত বছর শেষে এ জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। আর অবশিষ্টাংশ মূলত খেলাপি, অবলোপন (রাইট-অফ) করা এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ।
তবে ডিস্ট্রেসড ঋণের এই হিসাব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্যাংকিং নীতি প্রণয়নকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে ডিস্ট্রেসড ঋণের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে সাধারণত যে ঋণ থেকে কোনো আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয় না, সেগুলোকে এই শ্রেণির ঋণ হিসেবে ধরা হয়। পুনঃ তফসিল করা ঋণের বিপরীতে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয়, তাই এসব ঋণকে ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে ধরা হয় না।