
বিতর্কিত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের পর দেশের শরীয়াহভিত্তিক সর্ববৃহৎ ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’-কে ঘিরে সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া উৎকণ্ঠা ও ভীতি দ্রুত কেটে যেতে শুরু করেছে। ব্যাংকটির ওপর আমানতকারীদের বিশ্বাস পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নগদ টাকা তুলে নেওয়ার যে হিড়িক পড়েছিল, তা এখন অনেকটাই স্থিমিত। উল্টো পূর্বে বন্ধ বা অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করা নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো আবার নতুন করে সচল করতে শুরু করেছেন গ্রাহকেরা।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৫৫২টি এবং বুধবার ১ হাজার ৪৪২টি অ্যাকাউন্ট পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত দুই দিনে প্রায় ২ হাজার পুরাতন গ্রাহক আবারও ইসলামী ব্যাংকের সাথে তাদের নিয়মিত ব্যাংকিং ও লেনদেন শুরু করেছেন। ফিরে আসা এসব অ্যাকাউন্টে দুই দিনেই জমা পড়েছে ১৫০ কোটি টাকারও বেশি আমানত। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবারের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া না গেলেও, এদিনও ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতি বেশ ইতিবাচক ছিল বলে জানা গেছে।
এদিকে, দেশের বৃহত্তম এই বেসরকারি ব্যাংকের নগদ তারল্যের প্রবাহ স্বাভাবিক ও শক্তিশালী রাখতে নীতিগত সহায়তার অংশ হিসেবে গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে আরও ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এর আগে গত রবিবার ২ হাজার ৬৭০ কোটি, সোমবার ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং মঙ্গলবার ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ফলে গত কয়েক দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ইসলামী ব্যাংকের প্রাপ্ত মোট তারল্য সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৭০ কোটি টাকায়।
ইসলামী ব্যাংকের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বুধবার পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট নগদ তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি জুনের ১ তারিখে ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ১৭ দিনে তারল্য কমেছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে ১ থেকে ১৪ জুনের মধ্যে গ্রাহকদের দ্বারা এককালীন উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। স্বস্তির বিষয় হলো, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমানত তুলে নেওয়ার সেই প্রবণতা ব্যাপকভাবে কমে এসেছে এবং নতুন তহবিল ব্যাংকে জমা হতে শুরু করেছে।
গ্রাহকদের এই ইতিবাচক সাড়ার বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসাইন বলেন, গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরছে। বুধবার একদিনেই প্রায় দেড় হাজার গ্রাহক আগে বন্ধ করা হিসাব পুনরায় চালু করে অর্থ জমা দিয়েছেন। আগের দিনও কয়েকশ গ্রাহক একই কাজ করেছেন। অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করা অনেক গ্রাহকও আবার ইসলামী ব্যাংকে অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন।
ভুল বোঝাবুঝি বা আতঙ্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, অস্থির পরিস্থিতিতে যারা হিসাব বা এফডিআর ভেঙে ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তারা চাইলে আগের হিসাব পুনরায় চালু রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ক্ষতি বা অতিরিক্ত চার্জের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকের সামগ্রিক পরিস্থিতি সংস্কারের লক্ষ্যে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। পরবর্তীতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তাদের উত্থাপিত সাত দফা দাবির কথা জানানো হয়।
ফোরামের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সকল অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শ করে সৎ, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড) গঠন করা; ২০১৭ সালে জবরদস্তিমূলকভাবে পরিবর্তিত মালিকানা ব্যাংকের প্রকৃত আদি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা; অতীতে ঘটে যাওয়া সমস্ত আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ লুটের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা; দেশ থেকে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা; ঋণ জালিয়াতিতে জড়িতদের ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে চিহ্নিত লুটেরা ও সুবিধাভোগীদের ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে চিরতরে অযোগ্য ঘোষণা করা।