দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আবারও এক গভীর আস্থাসংকটের মুখে পড়েছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা মো. খুরশীদ আলমের আকস্মিক মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রাহকদের মনে পুরোনো শঙ্কা ও আতঙ্ক নতুন করে দানা বেঁধেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশজুড়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় একযোগে আমানত তুলে নেওয়ার এক হিড়িক বা বেপরোয়া প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে, শুধু ২ জুন ২০২৬ তারিখেই দেশের ৬৫০টি শাখা থেকে আমানতকারীরা প্রায় পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা নগদ তুলে নিয়েছেন। একই দিনে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১১ হাজার সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব। তবে একদিনে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার। সংবাদমাধ্যম ‘দি ইনসাইটা’কে তিনি জানান, একদিনে তুলে নেওয়া অর্থের অঙ্ক পৌনে ২ হাজার কোটি নয়, বরং ১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। পাশাপাশি ১১ হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধের দাবিটিকেও তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। তবে আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ ও লাগামহীন অর্থ উত্তোলন যদি আরও এক-দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকে, তবে ব্যাংকের নগদ তারল্য সম্পূর্ণ শূন্যের কোটায় নেমে যেতে পারে।
আমানতকারীদের পিছুটান: ডিপিএস ও এফডিআর ভাঙার ধুম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানামুখী নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ায় গ্রাহকেরা তড়িঘড়ি করে নিজেদের আমানত নিরাপদ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি ডিপিএস ভেঙে ফেলছেন, আবার কেউ তুলে নিচ্ছেন স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) পুরো টাকা।
এমনই একজন ভুক্তভোগী গ্রাহক মোহাম্মদ রফিক। প্রায় ১৩ মাস আগে ভবিষ্যতের একটি বড় তহবিলের আশায় ইসলামী ব্যাংকে মাসিক ১০ হাজার টাকা কিস্তির ৫ বছর মেয়াদি একটি ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস) চালু করেছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমান অস্থিরতা তাকে সেই সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে বাধ্য করেছে। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মেয়াদ পূর্ণ হলে যে মুনাফা পাওয়ার কথা ছিল, সেটি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। তবুও টাকা নিরাপদে হাতে রাখাটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।”
রফিকের এই আতঙ্কের মূলে রয়েছে নতুন চেয়ারম্যানের অতীত রেকর্ড। তিনি আরও বলেন, “আমার উদ্বেগের মূল কারণ হলো নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নাম আসা। অতীতে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো মানুষের মনে আছে।”
একই পথে হেঁটেছেন আরেক গ্রাহক আব্দুর রশিদ। তিনি ব্যাংকটিতে ৫ লাখ টাকার একটি স্থায়ী আমানত বা এফডিআর রেখেছিলেন, যা থেকে প্রাপ্ত মাসিক মুনাফা দিয়ে তাঁর সংসার চলত। ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তিনি পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন। আব্দুর রশিদ বলেন, “ব্যাংকটি একসময় দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এস আলমের ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে আসার পর নানা বিতর্ক হয়েছে। এখন খুরশিদ আলমকে চেয়ারম্যান করার ঘোষণার পর আবারও সেই পুরোনো প্রভাব ফিরে আসতে পারে। আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি, তাই এফডিআর ভেঙে টাকা তুলে নিয়েছি।”
ক্ষতি স্বীকার করেও স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “প্রতি মাসে মুনাফা পেতাম। সেটি বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত মূলধন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না।”
গ্রাফের মতো ওঠানামা করছে তারল্য প্রবাহ
ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের হাতে নগদ তারল্য বা উদ্বৃত্ত ফান্ড ছিল প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২৫ মে সেটি ৩০০ কোটি টাকা কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪০০ কোটিতে। ২৬ মে আরও ১৫০ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে তারল্য নামে ১১ হাজার ২৫০ কোটি টাকায়। এর পরের দুই দিন অর্থাৎ ২৭ ও ২৮ মে ব্যাংকের তারল্য স্থিতি ছিল প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, মে মাসের শেষ সপ্তাহের ওই হ্রাস ছিল মূলত কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে পশু কেনাকাটা ও সাধারণ উৎসবের খরচের জন্য স্বাভাবিক উত্তোলন। আর এই কারণেই ঈদ শেষে যখন কোরবানির পশু বিক্রির টাকা ও ব্যবসায়িক আমানত ব্যাংকে জমা হতে শুরু করে, তখন ১ জুন ২০২৬ তারিখে তারল্য এক লাফে বেড়ে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছায়।
কিন্তু ঠিক একই দিনে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া গ্রাহক বিক্ষোভ ও অস্থিরতা পুরো পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেয়। প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখায় উত্তেজনার পারদ চড়ার সাথে সাথে আমানত প্রত্যাহারের হিড়িক পড়ে। ফলে ২ জুনের সেই পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের ধাক্কায় পরদিন অর্থাৎ ৩ জুন ব্যাংকের তারল্য কমে ১০ হাজার ২৫০ কোটি টাকায় নেমে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গ্রাহকদের মনের এই তীব্র ভীতি ও অনাস্থা যদি দ্রুত দূর করা না যায়, তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তারল্য শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে। তেমনটা হলে পাক্ষিক কাল বাদে গ্রাহকরা শাখায় টাকা তুলতে গেলেও ব্যাংক ক্যাশ দিতে ব্যর্থ হবে।
অবশ্য আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, তারল্য সংকট মানেই কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়া নয়। ব্যাংকের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে তার মোট সম্পদ, ঋণ পোর্টফোলিও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা ও বন্ড বিক্রির ক্ষমতার ওপর। তবে এই নগদ অর্থের সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা গ্রাহকদের মনে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করে— যা যেকোনো ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় মরণফাঁদ।
সার্বিক বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার ‘দি ইনসাইটা’কে বলেন, “একদিকে এতোগুলো টাকা তুলে নেয়া একটা বড় ধাক্কা। আবার আরেকদিকে এটাকে স্বাভাবিকও বলা যায়। অতীতেও এভাবে মানুষ টাকা তুলে নিয়ে গেছে। আবার ফেরতও এসেছে। তবে এটা যদি গ্রাহকদের আন্দোলনকে ঘিরে হয় এবং এই টাকা উত্তোলণ কর্মসূচি চলতে- তাহলে অবশ্যই এটা ইসলামী ব্যাংকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি। যদিও আমরা আশা করি এই পরিস্থিতি থাকবে না।”
সংকট উত্তরণের কৌশল নিয়ে জানতে চাইলে তিনি যোগ করেন, “আমাদের ম্যানেজমেন্টের কিছু স্ট্রাটিজি আছে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখো হয়েছি আমরা। কিন্তু সেটা কেটেও উঠেছি। আমরা অবশ্যই চাইবো- জনগণের যে পারসেপশনে, সেখানে যেনো আস্থাটা টিকে থাকে, সেই চেষ্টা করে যেতে।”
দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় হিসাব বন্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্বীকার করে তিনি বলেন, “সেভিংস বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সেভাবে বন্ধ হচ্ছে না। মানুষ মূলত তার ডিপিএসগুলো তুলে নিচ্ছে। তবে মানুষের এই অভিমান বেশিদিন থাকবে না। কারণ, দিনশেষে মানুষ শরিয়াহভিত্তিক যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চায়, সেই আস্থার ঠিকানাই ইসলামী ব্যাংক। সুতরাং আমি মনে করি মানুষ ফেরত আসবেই।”
তবে ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ডিপিএস বা এফডিআরের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্কিমগুলো হলো একটি ব্যাংকের তহবিলের মূল স্থায়িত্বের উৎস। দৈনন্দিন খরচের জন্য চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তোলা স্বাভাবিক ব্যাংকিং আচরণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ডিপিএস ভেঙে ফেলা মূলত গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
তারল্য সংকট আসলে কী?
সহজ ভাষায়, তারল্য সংকট হলো এমন একটি সাময়িক পরিস্থিতি যখন কোনো ব্যাংকের ভল্ট বা হাতে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক চাহিদামতো নগদ অর্থ বা ক্যাশ টাকা থাকে না। ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানতের সিংহভাগ টাকা অন্য গ্রাহকদের ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে খাটায় এবং একটি নির্দিষ্ট অংশ তরল বা নগদ আকারে নিজেদের কাছে ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। কিন্তু যখন কোনো গুজবে বা আতঙ্কে হাজার হাজার গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে ব্যাংকে হুমড়ি খেয়ে পড়েন (যাকে ব্যাংকিং ভাষায় 'ব্যাংক রান' বলা হয়), তখন কোনো ব্যাংকের পক্ষেই তাৎক্ষণিকভাবে সবার টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হয় না। এর ওপর যদি বেনামি ঋণ বা খেলাপি ঋণের কারণে নগদ অর্থের আগমন বন্ধ হয়ে যায়, তবে এই সংকট আরও প্রকট হয়। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকগুলো তখন 'কল মানি মার্কেট' থেকে চড়া সুদে ধার নেয় অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে রেপো বা বিশেষ তহবিল সহায়তা প্রার্থনা করে।
চেয়ারম্যান পদ ঘিরে রণক্ষেত্র ও বিক্ষোভ
গত ২৪ মে ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির ঠিক আগের শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. জোবাইদুর রহমান পদত্যাগ করেন। আর সেই রাতেই তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিলে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ঈদের ছুটির মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে এই নিয়োগের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শুরু হয়।
ছুটি শেষে ১ জুন ঢাকার দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শত শত বিক্ষুব্ধ গ্রাহক দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাঁরা খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল, এস আলম গ্রুপের পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ দাবি করেন। একই দিনে সিরাজগঞ্জ, মাগুরা ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমান্তরাল আন্দোলন চলে।
১ জুন ঢাকায় অবস্থানরত আন্দোলনকারী গ্রাহকদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করলে বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত ও আহত হন। পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান। তীব্র প্রতিবাদের মুখে নতুন চেয়ারম্যান সশরীরে ব্যাংকে যোগ দিতে পারেননি এবং প্রধান কার্যালয়ের বোর্ডরুমে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় পরিচালনা পর্ষদের সভাটি অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়।
নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে এই অচলাবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত এমডি জামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, “এটা সরকারের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। আশা করি, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতি হয়- এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না সরকার।”
খুরশীদ আলমের প্রতি গ্রাহকদের কেন এত অনাস্থা?
আন্দোলনকারী ও সাধারণ আমানতকারীদের প্রধান অভিযোগ হলো, মো. খুরশীদ আলম দেশের অন্যতম বিতর্কিত ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী 'এস আলম গ্রুপ'-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ব্যক্তি। গ্রাহকদের ভয়, ব্যাংকটি যখন বিগত বছরের লুটপাটের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন এমন নেতৃত্ব একে আবারও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবে।
তা ছাড়া, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে কর্মকর্তাদের তীব্র গণআন্দোলনের মুখে যে কয়জন শীর্ষ কর্মকর্তা অপসারিত বা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন, খুরশীদ আলম ছিলেন তাদের অন্যতম। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিতাড়িত একজন কর্মকর্তাকে দেশের বৃহত্তম ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোকে নৈতিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না গ্রাহকেরা।
এর ওপর, ২৪ মে খুরশীদ আলমের নিয়োগের দিনই ব্যাংকের বর্তমান সফল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পরিচালনা পর্ষদ 'বাধ্যতামূলক ছুটিতে' পাঠালে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়ে। গ্রাহকদের দাবি, ওমর ফারুক খানকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে এবং বিতর্কিত খুরশীদ আলমকে অপসারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাফাই ও নৈতিক স্খলনের প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুরশীদ আলমকে ‘ঋণখেলাপি’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করে, খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে খেলাপি নন, তবে তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক’ থেকে নেওয়া ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) টাকার ঋণ পরিশোধ না করায় সেটি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। আন্দোলনকারীদের মতে, স্ত্রীর কোম্পানির এই বিশাল ঋণখেলাপির দায় এবং নৈতিক স্খলনই তাকে এই সংবেদনশীল পদের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য করে তোলে।
এস আলম-পরবর্তী কালো অধ্যায়ের ছায়া
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটটি ২০১৭ সালের সেই মালিকানা পরিবর্তনের কালো অধ্যায়ের সঙ্গেই যুক্ত। ২০১৭ সালে জোরপূর্বক ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকার বেনামি ও সন্দেহজনক ঋণ বিতরণের অভিযোগ ওঠে।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে পাচার হওয়া প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদমান পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক তিনটি নামী অডিট প্রতিষ্ঠান—EY, Deloitte এবং KPMG-কে নিয়োগ করেছে। একই সাথে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পাচার হওয়া টাকা শনাক্তে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করেছে। গ্রাহকদের চোখে খুরশীদ আলমের নিয়োগ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং অতীতের সেই ব্যাংক দখল ও ঋণ লুটেরই এক ধারাবাহিক অপচেষ্টা।
জাতীয় অর্থনীতিতে অশনি সংকেত
ইসলামী ব্যাংকের মতো দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া মানে সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়প্রবণতার ওপর বড় আঘাত। এই সংকট এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিজেই বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে।
রয়টার্সের ২৩ মে ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি (৬০০ বিলিয়ন) টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। উচ্চ ঋণব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও অর্থায়নের কঠিন পরিস্থিতি এমনিতেই দেশের সবুজ শিল্পায়ন ও বিনিয়োগকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম প্রধান একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বা অস্বচ্ছ নিয়োগের কারণে তৈরি হওয়া আস্থাহীনতা পুরো জাতীয় অর্থনীতিকেই এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।