
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নগদ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রবাসীরা যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রণোদনা হিসেবে পাবেন তারা।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের ওপর ১ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। এই সুবিধা প্রবাসী আয়ের বিদ্যমান ক্যাশ ইনসেনটিভ ব্যবস্থার মতোই কার্যকর হবে এবং এটি প্রবাসীদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও জানান, ব্যক্তিগত ভোগের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিবর্তে যারা শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ আনবেন, তাদের উৎসাহিত করতেই এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো প্রবাসী যদি ১০ কোটি ডলারের ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তাহলে সরকার তাকে ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার নগদ প্রণোদনা দেবে।
এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের অবস্থানরত দেশগুলোর ব্যবসা ও বিনিয়োগ মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সেই সংযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায় সরকার।
তবে নীতিগত অনুমোদন মিললেও বাস্তবায়নের আগে একটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে বলে জানান তিনি। এ জন্য প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের উদ্দেশ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরেকটি উদ্যোগ হিসেবে বিদেশে বিডার অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথাও জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান। প্রথম ধাপে চীনে অফিস খোলা হবে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশে অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, এসব অফিসে স্থায়ী বেতনভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে কমিশন বা পারফরম্যান্সভিত্তিক পারিশ্রমিক ব্যবস্থায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। বিনিয়োগ আনতে পারার সাফল্যের ওপরই তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ চীনা নাগরিকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এ ছাড়া দেশের ছয়টি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপও অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)—এই ছয়টি সংস্থাকে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, বর্তমানে প্রতিটি সংস্থার গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকার প্রধান দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। অতীতে এসব সংস্থার বোর্ড সভা গড়ে পাঁচ বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তার মতে, আদর্শভাবে ছয় মাস পরপর বোর্ড সভা হওয়া উচিত।
এই একীভূত প্রক্রিয়ায় কোনো সংস্থাকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, আইনগত ও কাঠামোগত বাস্তবায়ন পরবর্তী সরকারের সময়ে সম্পন্ন হবে। আপাতত নতুন কাঠামোর নকশা ও পরিকল্পনা প্রণয়নই অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
এদিকে, বিডার কার্যপরিধির আওতায় বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিশনভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের পথ সহজ করা হবে।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।