
হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা ও চলমান বিচারাধীন (sub-judice) অবস্থান উপেক্ষা করে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসিতে বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমানকে পুনর্নিয়োগ দেওয়ার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক; এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে।
হাইকোর্ট ডিভিশনের কোম্পানি ম্যাটার নং ১৫/২০২৬ মামলায়, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি-এর মোট শেয়ারের কমপক্ষে ১০% প্রতিনিধিত্বকারী শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের সুরক্ষার দাবিতে দায়েরকৃত রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে, ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দেওয়া আদেশে ৪২১তম বোর্ড সভায় এমডি পুনর্নিয়োগ সংক্রান্ত এজেন্ডা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না; সে বিষয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয় এবং বিষয়টি বিচারাধীন (sub-judice) থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংককে উক্ত নিয়োগ বিষয়ে কোনো অনুমোদন না দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪২১তম সভা ও ‘সুপার মেজরিটি’ নামের অজানা ধারণা
নথিপত্র অনুযায়ী, ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৪২১তম বোর্ড সভায় হাবিবুর রহমানকে পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এবং তা sub-judice হয়ে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি অনুমোদন বা বাতিল না করে এক ব্যতিক্রমী ও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংককে পুনরায় প্রস্তাব পাঠাতে বলে, কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় তথাকথিত “সুপার মেজরিটি” দ্বারা প্রস্তাব পাস করাতে হবে। অথচ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১, কোম্পানি আইন, বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সার্কুলারেই ‘সুপার মেজরিটি’ নামে কোনো বোর্ড ভোটিং ধারণার অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান মনসুর এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন অর্থাৎ ৯০% পরিচালকের সমর্থন ছাড়া তিনি এই অনুমোদন দেবেন না। তবে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে এই ৯০% এর মানদণ্ড উল্লেখ করা হয়নি; বরং বিষয়টির ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে নমনীয়তা রাখার সুযোগ সচেতনভাবেই খোলা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যদি বাংলাদেশ ব্যাংক ৯০% এর চেয়ে কম সংখ্যক পরিচালকের সমর্থন নিয়েও যদি অনুমোদন দিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় সেটিকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন, কারণ তাদের আবিষ্কৃত “সুপার মেজরিটি” তত্ত্বের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংক দেয়নি।
অপরদিকে, সন্ত্রাসী আক্রমণ, গুলিবর্ষণ, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানির হুমকির কারণে হাবিববিরোধী পরিচালকদের এই ঝটিকা বোর্ড মিটিংয়ের বাইরে রাখা গেলে শুধুমাত্র সভায় উপস্থিত পরিচালকদের ৯০% এর সমর্থন পাওয়া হাবিবুর রহমানের পক্ষে দুরূহ নয়।
আইনজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যত ৪২১তম সভাকে পাশ কাটিয়ে বিষয়টিকে নতুন সভায় স্থানান্তর করে আদালতের আদেশের সীমার বাইরে নেওয়ার পথ তৈরি করে।
বোর্ডকে ‘অনুকূল’ করতে ৩০ দিনে ৩ পরিচালক
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো - গত ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৩ জন নতুন পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে, যাঁরা সবাই হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, এর ফলে বোর্ডের ভারসাম্য কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করে একটি অনুকূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করা হয়েছে।
বিরোধী পরিচালকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, মামলা ও হুমকি
ডকুমেন্ট ও সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, যারা হাবিবুর রহমানের পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা করেছেন; তাঁদের একের পর এক ভয়ভীতি, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে গত এক সপ্তাহের ভেতরে। এই সময়ের মধ্যে পরিচালক অশোক কুমার সাহার বাসভবনে সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। বোর্ড মিটিংয়ে যোগ দিলে তাঁর প্রাণনাশ করা হবে বলে একটি চিরকুটে তাঁকে সরাসরি হুমকি দিয়ে যায়। পাশাপাশি পরিচালক মোহাম্মদ জাহেদুল হককে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমেদকে বোর্ড সভায় উপস্থিত না হতে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে বেআইনি হুমকিপত্র দেওয়া হয়। এ ছাড়া অন্যান্য পরিচালকদের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনার ফলে একাধিক পরিচালক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সভায় উপস্থিত হতে পারছেন না, যা বোর্ড সভার বৈধতা ও স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২২ জানুয়ারির সভা স্থগিত, কিন্তু ‘হঠাৎ সভা’-র আশঙ্কা
এই সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত ৪২২তম বোর্ড সভা স্থগিত করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এখন পরিকল্পিতভাবে ২৭ বা ২৮ জানুয়ারি হঠাৎ সভা ডেকে কোনো পূর্ব ঘোষণা বা পূর্ণ এজেন্ডা প্রকাশ না করে প্রস্তাব পাস করানো হবে।
এর পর মাত্র ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ২৯ জানুয়ারি (হাবিবুর রহমানের বর্তমান চুক্তির শেষ দিন) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে, যাতে কোনো শেয়ারহোল্ডার আদালতে যাওয়ার সুযোগ না পান।
চারটি বড় আইনি ও নীতিগত লঙ্ঘনের অভিযোগ
নথিপত্র বিশ্লেষণে যে চারটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে -
১. অযোগ্য ব্যক্তিকে পুনর্নিয়োগের চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শন প্রতিবেদনে ও শোকজ নোটিশে যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, এস আলমের অনুকূলে ২৬০০ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে; তাঁকেই পুনর্নিয়োগ দেওয়া ব্যাংক কোম্পানি আইন ও BRPD সার্কুলার ৫ (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)-এর সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়াও হাবিবুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়েরকৃত একটি প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি।
২. সভার তারিখ গোপন রেখে আদালত এড়ানোর চেষ্টা
পর্যবেক্ষক নিয়োগপত্র ও দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী অন্তত ৩ দিনের নোটিশ প্রয়োজন হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা দেওয়া হচ্ছে না; যাতে কেউ আদালতে যেতে না পারে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জনাব আরিফ হোসেনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি ঢাকা ওয়াচকে বলেন, “হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে কোনো বোর্ড মিটিংয়ের আয়োজন করলে এবং সেটি আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত ৬ জানুয়ারিতে প্রদত্ত নির্দেশনার পরিপন্থী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উক্ত বোর্ড মিটিংয়ে পর্যবেক্ষকই পাঠাবে না।”
তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের নির্দেশনার শর্তসমূহ উপেক্ষা করে স্বল্প নোটিশে বোর্ড সভা আয়োজনের একটি বাস্তব ও আসন্ন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আদালতের বিদ্যমান আদেশ এবং স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হবে, এবং এতে আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়াই নির্দেশনার কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
৩. এজেন্ডা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করেই প্রস্তাব উত্থাপনের আশঙ্কা
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যাচ্ছে, বোর্ড সদস্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের কাছে প্রেরিত এজেন্ডা তালিকায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত না রেখেই সভায় তা উত্থাপনের বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, এজেন্ডায় পূর্বঘোষণা ছাড়া এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন বোর্ড সভার স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদ সমাপ্তির বিষয়টি পূর্বানুমেয় হওয়ায় একে কোনোভাবেই জরুরি বা ‘অপ্রত্যাশিত’ এজেন্ডা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। তবুও যদি এজেন্ডার বাইরে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপনের চেষ্টা করা হয়, তবে তা আদালতের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রক বিধানকে পাশ কাটানোর একটি সুস্পষ্ট কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; যা প্রতিরোধমূলক আদেশ (preventive injunction) প্রদানের যৌক্তিকতা সৃষ্টি করে।
৪. নজিরবিহীন দ্রুত অনুমোদনের চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী এমডি পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ২ মাস আগে পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারেই উক্ত আইনি বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, সেখানে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার নজির বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসেই নেই এবং এমন কোনো অনুমোদন নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
প্রশ্ন উঠছে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থরক্ষার দায় নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি আদালতের আদেশ, নিজস্ব সার্কুলার ও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম এভাবে পাশ কাটানো হয়, তবে তা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ভয়ংকর নজির স্থাপন করবে।