
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বাড়িতে একা থাকার সুযোগে ওই নারীর ঘরে ঢুকে তাকে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। পরে বাধা ও চিৎকার করায় তাকে মারধর এবং বিষয়টি প্রকাশ করলে হত্যার হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। মামলা করার পর ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
ঘটনাটি গত ৫ আগস্ট দুপুরে উপজেলার চরকুমারিয়া ইউনিয়নের ঢালী কান্দি এলাকায় ঘটে। অভিযুক্ত মিলন ঢালী (৩৩) ওই এলাকার আক্কাস ঢালীর ছেলে। তিনি চরকুমারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢালী কান্দি গ্রামের মৃত গনি উকিলের মেয়ে আইরিন লাবনীকে (২৩) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন মিলন। রাস্তাঘাটেও তাকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে আইরিনের মা ও পরিবারের সদস্যরা স্থানীয়ভাবে মিলনকে একাধিকবার সতর্ক করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দুপুরে আইরিন তার বাবার বাড়ির একটি কক্ষে একা ছিলেন। পরিবারের অন্য কেউ তখন বাড়িতে ছিলেন না। এই সুযোগে পাশের বাড়ির বাসিন্দা মিলন সেখানে প্রবেশ করেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি আইরিনকে জড়িয়ে ধরে প্রথমে শ্লীলতাহানি এবং পরে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইরিন নিজেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে চিৎকার শুরু করেন। এতে অভিযুক্ত তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আশপাশে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে মিলন ওই নারীকে হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে আহত আইরিনকে উদ্ধার করে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ৯ আগস্ট আইরিনের মা নাজমা বেগম বাদী হয়ে সখিপুর থানায় মিলন ঢালী (৩৩) ও আনোয়ার ঢালী (৩৬)-এর বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলা করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মামলা দায়েরের পর থেকেই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মিলন ঢালী ও তার লোকজন আইরিন, তার মা ও ভাইদের হামলা এবং হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।
নাজমা বেগমের অভিযোগ, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে মিলন তাকে ফোন করে মামলা প্রত্যাহার না করলে পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং তাদের বাড়িঘরে পেট্রোল বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। নিরাপত্তার কারণে গত সাত দিন ধরে আইরিন ও তার পরিবার আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় মাদবর ওয়াসিম ঢালী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিলন ওই নারীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। সমাজের মুরুব্বি হিসেবে তিনি তাকে একাধিকবার সতর্ক করেছেন। এরপরও গত ৫ আগস্ট বাড়িতে একা পেয়ে ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তার দাবি।
ওয়াসিম ঢালী বলেন, “মেয়েটি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অসুস্থ মানুষ। তাই বাবার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে। তার চিৎকারে মানুষ এগিয়ে না আসলে মেয়েটিকে মেরেই ফেলতো। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার চাই। মিলন রাজনৈতিক প্রভাবে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন সরদার অভিযোগ করেন, মিলন মাদক সেবন করেন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত। তার ভাষ্য, ঘটনার সময় আইরিনের মা পাশের বাড়িতে থাকায় ওই নারী একা ছিলেন। এ সুযোগেই তার ওপর হামলা করা হয়।
তিনি বলেন, “আজকে শুনলাম ফোন করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। মামলা হওয়ার পরেও পুলিশ তাকে ধরতে পারছে না এটা দুঃখজনক। দ্রুত তাকে ধরতে না পারলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ তাকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করুন।”
ভুক্তভোগী আইরিন লাবনী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মিলন আমাকে কুপ্রস্তাব দিচ্ছিলো। আমি রাজি না হওয়ায় আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতো। আমি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাই মায়ের সহযোগিতা পেতে বাবার বাড়ীতে এসেছি।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার দিন তার মা পাশের বাড়িতে যাওয়ার পর মিলন ঘরে প্রবেশ করেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে তাকে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি এবং পরে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। চিৎকার করলে আশপাশের লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে তাকে মারধর এবং কাউকে জানালে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যান অভিযুক্ত।
আইরিন আরও বলেন, “এরপর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ী ফেরার চেষ্টা করি। তবে মামলা তুলে নিতে মিলন মাকে ফোন করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তাই ভয়ে বাড়ীতে যাচ্ছি না। পুলিশও তাকে আটক করছে না। আমরা কার কাছে যাবো? কে আমাদের দায়িত্ব নিবে। আমি বিচার পাচ্ছি না কোথাও? আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করি তার যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।”
মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, “আগে জানলে মামলা করতাম না। মামলা করে এখন নিজেরাই পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মামলা উঠিয়ে নিতে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে মিলন ও তার পরিবারের লোকজন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত ও তার পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। নাজমা বেগমের ভাষ্য, “তারা বিএনপির বড় নেতা, এলাকায় প্রভাব বেশি। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চায় না।”
মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার স্বামী নেই, কাকে নিয়ে মামলা লড়বো? আমাকে হুমকি দিয়ে বলে মামলা না তুলে নিলে হত্যার করে ঘরবাড়ি পেট্রোল বোমা মেরে উড়িয়ে দিবে। এই দেশে কি প্রশাসন নেই? আমি সরকারের কাছে ন্যায় বিচারক ও আমাদের নিরাপত্তা চাই।”
অভিযুক্ত মিলন ঢালীর বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন তিনি।
ভিডিওতে মিলন দাবি করেন, আইরিনের ভাইয়ের কাছে তিনি টাকা পাবেন। সেই পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে আইরিনের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। তিনি ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এইচ এম জাকির হোসেন বলেন, ওই এলাকায় ছাত্রদলের কোনো কমিটি নেই। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার দায় ছাত্রদল নেবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, কমিটি সক্রিয় থাকলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকত। তার ভাষ্য, “কোন অপরাধীর স্থান ছাত্রদলে নেই এটা স্পষ্ট।”
অভিযুক্ত মিলন ঢালী ছাত্রদলের কোনো পদে আছেন কি না, তা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এইচ এম জাকির হোসেন।
সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ধর্ষণচেষ্টার মামলা হয়েছে। মামলার কপি আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ওসি।