
রাজশাহীতে ঋতু খাতুন ওরফে রিয়া (২২) নামে এক গৃহবধূকে নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী মিজানুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজশাহীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে মহানগর ছাত্রদল। তবে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ছাত্রদল ও জামায়াতের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৫ মে) রাতে রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের উদ্যোগে মহানগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি মনিচত্বর প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
নিহত রিয়া রাজশাহী মহানগরীর ধরমপুর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান মিজানের স্ত্রী ছিলেন। গত বুধবার (১৩ মে) সকালে রিয়ার বাবার বাড়ির লোকজন খবর পান যে, শ্বশুরবাড়িতে রিয়ার মৃত্যু হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, রিয়াকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এই ঘটনায় রিয়ার মা শিলা খাতুন বাদী হয়ে মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
নিহতের মা শিলা খাতুনের অভিযোগ, জামাতা মিজানুর রহমান পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন এবং প্রায়শই যৌতুকের দাবিতে রিয়ার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। তবে মামলা দায়েরের দুই দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ মূল অভিযুক্ত মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এই ধীরগতির প্রতিবাদেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে মহানগর ছাত্রদল। ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দাবি, অভিযুক্ত মিজানুর রহমান নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কারণেই পুলিশ তাকে ধরতে গড়িমসি করছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব ইমদাদুল হক লিমন বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী মিজান আমাদের বোন রিয়াকে হত্যা করেছে। ছাত্রদল কোনো হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না। রিয়ার হত্যার বিচার না হলে ছাত্রদল রাজপথে থাকবে।’
অন্যদিকে, ছাত্রদল আসামিকে জামায়াত নেতা হিসেবে দাবি করলেও দলটির রাজশাহী মহানগর শাখার সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। মিজানুর নামে আমাদের দলে কেউ নেই। ছাত্রদল কেন বিক্ষোভ করেছে তারাই বলতে পারবে।’
দলটি অস্বীকার করলেও স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত কিছু তথ্যপ্রমাণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে স্লোগান দিচ্ছেন। অপর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মহানগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) জামায়াতে ইসলামীর নতুন কমিটি ঘোষণার সময় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে এই মিজানুর রহমান মিজানের নামই ঘোষণা করা হচ্ছে।
মামলার সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কবির জানান, এই ঘটনায় মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জনকে আসামি করে মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে এবং পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে।
নিহত রিয়ার সুরতহাল রিপোর্টের বরাত দিয়ে ওসি আরও জানান, রিয়ার মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশ ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে।’