
পায়রা নদীর উত্তাল ঢেউ ও ভোরের কুয়াশার মাঝে ছোট্ট একটি নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। নৌকার মাঝখানে বসে রয়েছে মাত্র পাঁচ বছরের একটি শিশু, আর নৌকা চালাচ্ছেন ২৬ বছরের মীম আক্তার। তার জীবন কোনো গল্প নয়—এটি প্রতিদিনের অস্থির সংগ্রামের নাম।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের জেলেপল্লীতে জন্ম নেওয়া মীমের বাবার নাম জলিল মোল্লা, যিনি পেশায় জেলে ছিলেন। কিন্তু মাত্র তিন মাস বয়সে তিনি হারান বাবাকে, যিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর মা নাজমা বেগম অন্যত্র বিয়ে করেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে মীম ছিলেন মেজ। বড় ভাই জাকির হোসেন চেষ্টা করেছিলেন সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার, তবে তিনি বর্তমানে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
২০১৮ সালে মীমের বিয়ে হয় একই উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের আমড়াগাছিয়া গ্রামের রুবেল হাওলাদারের সঙ্গে। কিন্তু এক বছরের মাথায় জন্ম নেওয়া কন্যা ইয়ানুর মাত্র তিন মাস বয়সে স্বামী নিখোঁজ হয়ে যান। এই বিপর্যয়ের মধ্যে মীম একাই শিশুকে কোলে নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন।
সন্তানের জীবন ও জীবিকার তাগিদে মীম ফিরে যান বাবার পেশায়। ধার-দেনা করে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় একটি ছোট নৌকা ও সামান্য জাল কিনে পায়রা নদীতে নামেন। উত্তাল ঢেউ, ঝড়-বৃষ্টি, নদীর রাক্ষুসী রূপ—সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি শুরু করেন জেলের জীবন। নারী হিসেবে নদীতে মাছ ধরা তার জন্য ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঁচ বছর ধরে মীম এই পেশায় টিকে আছেন। বহুবার নৌকা ডুবেছে, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তবুও হাল ছাড়েননি। তিনি পোয়া, পাঙ্গাস, তপসীসহ বিভিন্ন মাছ ধরেন। মাছ না থাকলে বালুর চরে চেউয়া মাছ ধরে সংসার চালান। কখনো নদী, কখনো চর—প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তায় ভরা। মাছ না হলে উপোষও করতে হয়, পাঁচ বছরের শিশুকে কোলে নিয়েই।
মীম চোখের পানি মুছে বলেন, “মোর জীবন বড়ই কষ্টের। দু’মুঠো ভাতের আশায় ঝড়-ঝঞ্ঝা, উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা কইরা নদীতে নামি। মাছ না পাইলে মাইয়াডা লইয়া উপোষ থাকি।”
পেশায় জেলে হলেও এখনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি তিনি। কোনো জেলে কার্ড নেই, ফলে সরকারি কোনো সুবিধা বা সহায়তার আওতায় পড়েন না।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, “আমতলী উপজেলায় মীম একমাত্র নারী জেলে। তবে তার নাম এখনও জেলে তালিকায় নেই। যত দ্রুত সম্ভব তার নামে কার্ড ইস্যু করা হবে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরে বাঁধা ছোট একটি নৌকা, তাতে অল্প কিছু জাল, জাল ধরার লাঠি আর ভাসানোর শোলা। সেই নৌকাতেই মেয়েকে বসিয়ে গান গুনগুন করতে করতে মীম মাঝনদীতে জাল ফেলেন। সন্ধ্যার আগে মাছসহ ফেরেন। ছায়াহীন আকাশ, প্রখর রোদ, ঝড়—সবই মীম ও ইয়ানুর নিত্যসঙ্গী।
গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ফারুক আকন বলেন, “মীম আক্তারের নাম জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
আমতলী উপজেলা মেরিন ফিশারিজ অফিসার মো. অলিউর রহমান জানান, “তার নাম তালিকায় না থাকার কারণ খতিয়ে দেখা হবে। নতুনভাবে জেলে নিবন্ধনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চলমান।”
উত্তাল পায়রার বুকে দাঁড় টেনে নৌকা চালানো এই নারী শুধু নিজের নয়, তার শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ বাঁচাতে লড়ছেন। রাষ্ট্রের কাছে তার একটাই দাবি—নিজের পেশার স্বীকৃতি।