
চাঁদার দাবিতে ফোনে সাড়া না পেয়ে চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা নিজেদের ‘বড় সাজ্জাদ’-এর লোক বলে পরিচয় দিয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীর।
শুক্রবার (০২ জানুয়ারি) স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় তার বাড়ির দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। ঘটনার সময় তিনি ও পরিবারের সদস্যরা বাসায় ছিলেন। তবে কেউ আহত হননি বলে নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া।
টেক্সটাইল, পোশাক ও জ্বালানি খাতে ব্যবসা থাকা মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “দুবাই থেকে ফোন করে সাজ্জাদ নামে একজন আমাদের পরিবারের ব্যবসায়ী গ্রুপ থেকে চাঁদা দাবি করেছিল। বিষয়টি আমি গুরুত্ব দিইনি। পরে কয়েকজন এসে সকালে বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।”
নগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, একটি মাইক্রোবাসে করে আসা আটজনের একটি দল বাড়ির সামনে ও পেছন দিক থেকে গুলি ছুড়ে দ্রুত সরে যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছেন। তবে শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি।
কে এই ‘বড় সাজ্জাদ’
চালিতাতলী এলাকার আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদের নাম নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকেই আলোচনায়। সে সময় তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং খুনসহ একাধিক মামলার আসামি হন।
১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান নিজ বাড়ির সামনে খুন হন। ওই মামলায় সাজ্জাদের নাম উঠে এলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পান। এরপর অপরাধ জগতে তার নাম আরও ছড়িয়ে পড়ে।
২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে আটজন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে সাজ্জাদের মৃত্যুদণ্ড হয়। পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি এ মামলায় খালাস পান। একই বছর একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি দুবাইয়ে পালিয়ে যান বলে গুঞ্জন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে জানা যায়, ইন্টারপোলে তার নামে এখনও ‘রেড নোটিস’ জারি আছে— সেখানে তার নাম উল্লেখ রয়েছে সাজ্জাদ হোসেন খান।
চট্টগ্রামে অবস্থানকালে নুরুন্নবী ম্যাক্সন ও সরোয়ার হোসেন বাবলার সঙ্গে মিলে অপরাধ জগতে সক্রিয় ছিলেন সাজ্জাদ। ২০১১ সালের জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল এলাকা থেকে ম্যাক্সন গ্রেপ্তার হন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে সরোয়ারকে আটক করে পুলিশ। তখন তাদের কাছ থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি পিস্তল, একটি এলজি, একে-৪৭-এর দুটি ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়।
কারাগারে থাকাকালে সাজ্জাদের সঙ্গে সরোয়ার ও ম্যাক্সনের বিরোধ তৈরি হয় বলে প্রচার আছে। ২০১৭ সালে জামিনে মুক্ত হয়ে সরোয়ার ও ম্যাক্সন কাতারে যান। প্রায় তিন বছর সেখানে থাকার পর মারামারির এক ঘটনায় সাজা ভোগ শেষে সরোয়ারকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিমানবন্দরে তাকে আটক করে পুলিশ।
অন্যদিকে, বিয়ে করে ভারতে স্থায়ী হওয়া ম্যাক্সন ২০২২ সালে সেখানে মারা যান। তার পরিবারের অভিযোগ, স্ত্রী তাকে হত্যা করে ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে প্রচার করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সরোয়ার ও ম্যাক্সন দলছুট হলেও সাজ্জাদ বিদেশে বসে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও অপরাধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন।
গত বছরের নভেম্বরে বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকীয়া পাড়ায় বিএনপির চট্টগ্রাম-৮ আসনের মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ জনসংযোগে গেলে গুলির ঘটনায় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার নিহত হন। ওই ঘটনায় এরশাদ উল্লাহসহ আরও চারজন আহত হন। এ মামলায় সরোয়ারের বাবার দায়ের করা অভিযোগে ‘বড় সাজ্জাদ’কে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।