
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। দাবি পূরণ না হলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘেরাও করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশের শেষ বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।
‘দেশব্যাপী সরকার প্রযোজিত খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে’ এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
সমাবেশে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী অংশ নেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় জাদুঘরের সামনের খোলা জায়গা ছাড়াও আশপাশের সড়কে অবস্থান নেন দলের নেতা-কর্মীরা।
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগে আলটিমেটাম
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ছিনতাই-রাহাজানির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিও ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার সবচেয়ে বেশি দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর বর্তায়। তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে মন্ত্রী সংবিধান সংশোধনের কাজে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে চলমান অরাজকতা, গুম ও খুনের দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে ইকবাল হাসান মাহমুদেরও মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দুই মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল করা হবে। সেই মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘেরাও করে দাবি আদায় করা হবে।
‘এক স্বৈরাচারের পতনের পর আরেকটির উত্থান দেখছি’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি সরকারের দেশ পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েই তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর দেশে নতুন করে আরেকটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে। তবে পতিত শাসনব্যবস্থা এবং নতুন করে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদ—দুইয়ের বিরুদ্ধেই জনগণকে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন নাহিদ। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম হবে না। এ কারণে দেশের তরুণ সমাজ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতবিরোধী অভিযোগ ও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বক্তব্য
বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পার্বত্য অঞ্চলের অস্থিরতা, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই। জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে করিডর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কোনো অবৈধ করিডর স্থাপনের প্রস্তাব জনগণ মেনে নেবে না।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এনসিপির আহ্বায়ক। আগামী ডিসেম্বরে চুক্তিটি নতুন করে ন্যায্য ভিত্তিতে সম্পাদন না করা হলে জনগণকে নিয়ে আবারও আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন তিনি। বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে এবার কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দলের প্রার্থী হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা-৮ আসনে পরাজিত করা হয়েছিল। এবার তাঁকে পরাজিত হতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের বাইরে রাখার মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরাজিত হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুদ্ধের প্রভাবে ঢাকা ও কলকাতার বাজারে ভিন্ন চিত্র
সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেনও বক্তব্য দেন। তিনি কলকাতা ও বাংলাদেশের এলপিজির দামের তুলনা করে জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন।
আখতার হোসেন বলেন, কলকাতায় এলপিজির দাম প্রায় এক হাজার টাকা হলেও বাংলাদেশে একই ধরনের গ্যাস কিনতে গ্রাহকদের প্রায় দুই হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব যদি জ্বালানির বাজারে পড়ে থাকে, তাহলে কলকাতায় এর প্রভাব কেন দেখা যাচ্ছে না? বিষয়টি জ্বালানিমন্ত্রীকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
এ ছাড়া সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনারও আহ্বান জানান এনসিপির এই নেতা।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন যারা
এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারের সভাপতিত্বে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আকরাম হুসাইন।
এ ছাড়া জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও তাঁরা বক্তব্য দেননি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বড় জমায়েত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিকে মাঠপর্যায়ে এনসিপির অন্যতম বড় কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাবেশে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী অংশ নেন। কর্মসূচি সফল করতে আগের পুরো সপ্তাহজুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
শুক্রবার বেলা তিনটায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে এবং শাহবাগ এলাকায় নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের অনেকে বাসে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে কর্মসূচিতে যোগ দেন।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। প্রথমদিকে উপস্থিত হন সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল আমিন, সারোয়ার তুষার ও মনিরা শারমিন। এরপর বিভিন্ন দিক থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন।
বিকেল পৌনে চারটার পর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একটি বড় মিছিল বাংলামোটর থেকে শাহবাগে পৌঁছায়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তরের আরেকটি বড় মিছিল সমাবেশস্থলে প্রবেশ করে।
বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা পর্যায়ক্রমে বক্তব্য দেন।
সূত্র: প্রথম আলো