
শরীয়তপুরের জাজিরায় সুদের পাওনা টাকা আদায়ের অজুহাতে মাত্র ছয় মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য শিশুকে অপহরণের বুক কাঁপানো অভিযোগ উঠেছে আপন চাচির বিরুদ্ধে। অবশেষে মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কৌশলে ডেকে এনে অভিযুক্ত নারীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা। তবে আটকের পরও অপহৃত ফুটফুটে শিশুটিকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের হাজী মজিদ বেপারী কান্দি এলাকায়। অপহৃত শিশু জাহিদ রাফসান ওই এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী জুয়েল মল্লিক ও রাত্রি বেগম দম্পতির সন্তান।
৪ লাখ টাকার ঋণ ও পারিবারিক কলহ
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে নিজের জা (স্বামীর ভাইয়ের স্ত্রী) আমেনা বেগমের মধ্যস্থতায় সুদের ওপর চার লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন রাত্রি বেগম। গত বছর সেই ঋণের বিপরীতে সুদসহ সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধও করে দেন তিনি। তবে আমেনা বেগমের দাবি, তিনি আরও টাকা পাবেন। এই বাড়তি টাকার দাবিকে কেন্দ্র করেই মূলত দুই পরিবারের মধ্যে চরম বিরোধ ও কলহের সৃষ্টি হয়।
ভোরের আলো ফুটতেই শিশুকে গায়েব, ৫ লাখ টাকা দাবি
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, গতকাল শনিবার (১৬ মে) ভোরের দিকে চাচি আমেনা বেগম কিছুক্ষণের জন্য কোলে নেওয়ার কথা বলে শিশু জাহিদকে নিজের কাছে নেন। তবে বেশ কিছু সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও আমেনা বা শিশুটির কোনো খোঁজ মিলছিল না। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা ফোনে যোগাযোগ করলে আমেনা বেগম সাফ জানিয়ে দেন যে, জাহিদকে জীবিত ফেরত পেতে হলে তাদের পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে।
সন্তানের জীবন বাঁচাতে জাহিদের পরিবার কৌশলের আশ্রয় নেয়। আজ রোববার দুপুরে সেই দাবিকৃত টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে তারা আমেনাকে জাজিরায় ডেকে আনেন। আমেনাও টাকার লোভে তাঁর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে এসে অবস্থান নেন। তবে ধূর্ত এই নারী নিজের সাথে অপহৃত শিশুটিকে নিয়ে আসেননি। একপর্যায়ে পরিবারের স্বজনরা বিষয়টি গোপনে পুলিশকে জানালে পুলিশ এসে আমেনাকে হাতেনাতে আটক করে।
‘আমার বাবুটাকে কে খাওয়াচ্ছে?’: মা-চাচির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
দুই দিন ধরে কলিজার টুকরোকে না পেয়ে পাগলপ্রায় মা রাত্রি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘অনেক আগে টাকা-পয়সা লেনদেনের ঝামেলা মিটে গেছে। আমি তার (জা) সব টাকা পরিশোধ করে দিয়েছি। তারপরও ও আমার ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে। দুইদিন ধরে আমার বাচ্চাটাকে পাচ্ছি না। আমার ছয় মাসের অবুঝ সন্তানটা কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানি না। ওতো এখনো ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না, শুধু আমাকে না দেখলে কাঁদে। আমার বাবুটাকে কে খাওয়াচ্ছে, কে কোলে নিচ্ছে এই চিন্তায় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই।’
অন্যদিকে, পুলিশের হেফাজতে থেকেও নিজের অপরাধের পক্ষে সাফাই গেয়ে অভিযুক্ত আমেনা বেগম বলেন, ‘আমি আমি ঋণ করে টাকা এনে দিয়েছি। আমি সেই ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি। মাসে মাসে আমার টাকাগুলো পরিশোধ করে দেওয়ার কথা বলা হলেও ওরা টাকা দেয়নি। তাই আমি বাধ্য হয়ে টাকা আদায় করতে শিশুটিকে অপহরণ করেছি। আমার টাকা ফেরত না পেলে জাহিদকেও ফেরত দেবো না।’
শিশু উদ্ধারে পুলিশের চিরুনি অভিযান
আমেনাকে গ্রেফতার করা হলেও শিশু জাহিদ কোথায় আছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি প্রশাসন। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শরীয়তপুর জেলা পুলিশ সুপার রওনক জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অভিযুক্ত ওই নারীকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত শিশুটিকে উদ্ধার করা যায়নি। এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান।’