
ফুটবল মাঠে মাপা পাস আর চোখের পলকে বাঁকানো ফ্রি-কিকের জাদুতে একসময় কোটি কোটি অনুরাগী মাতাতেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম। বুটজোড়া তুলে রাখার অনেক বছর পরও মাঠের সেই অপ্রতিরোধ্য সাফল্যের ধারা এবার তিনি বজায় রাখলেন ব্যবসার পিচে। বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের অভিজাত তালিকায় সগৌরবে নিজের নাম লিখিয়েছেন এই ফুটবল কিংবদন্তি।
যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম ‘সানডে টাইমস’-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ ‘রিচ লিস্ট’ (ধনী তালিকা) অনুযায়ী, ডেভিড বেকহ্যাম ও তাঁর সহধর্মিণী ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের যৌথ সম্পদের আর্থিক মূল্য এখন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে এই তারকা দম্পতির নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.১৮৫ বিলিয়ন পাউন্ড (১১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড)। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের ক্রীড়া ইতিহাসের প্রথম ‘বিলিয়নিয়ার অ্যাথলেট’ বা ধনকুবের অ্যাথলেট হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়লেন বেকহ্যাম। এককালের স্টাইল আইকন ও খামখেয়ালি হেয়ারস্টাইলের জন্য আলোচিত ফুটবলারের এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে ওঠার গল্প এটি।
বেকহ্যামের পকেটে ‘মেসি ইফেক্ট’
বেকহ্যামের এই রকেটের গতিতে সম্পদ বৃদ্ধির নেপথ্যে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসি। ডেভিড বেকহ্যামের আংশিক মালিকানাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার (এমএলএস) ক্লাব ‘ইন্টার মায়ামি সিএফ’-এর ব্র্যান্ড ভ্যালু ও বাণিজ্যিক মূল্য রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়েছে মূলত আর্জেন্টাইন মহাতারকা মেসির যোগদানের পর থেকেই।
বর্তমানে ৫১ বছর বয়সি বেকহ্যাম কেবল মেসিকে মায়ামিতেই উড়িয়ে আনেননি, বরং এই মহাতারকাকে আরও তিন বছর ক্লাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেছেন। বেকহ্যামের এই ব্যবসায়িক চাল ফুটবলপ্রেমীদের যতটা রোমাঞ্চিত করেছে, তার চেয়েও বেশি স্ফীত করেছে তাঁর ক্লাবের ব্যাংকের খাতা।
শুধু স্টেডিয়ামের টিকিট বিক্রি বা বৈশ্বিক স্পনসরশিপের অর্থই নয়, বেকহ্যামের মায়ামি সাম্রাজ্য এখন রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতেও বড় থাবা বসিয়েছে। ইন্টার মায়ামির নতুন হোম গ্রাউন্ডকে কেন্দ্র করে যে ১৩১ একরের বিশাল বাণিজ্যিক ও আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে, তার বর্তমান বাজার দর প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে।
পশ স্পাইসের ফ্যাশন বিপ্লব ও অ্যাডিডাস চুক্তি
বেকহ্যাম পরিবারের এই বিলিয়নিয়ার ক্লাবে প্রবেশের কৃতিত্ব কেবল ডেভিডের ফুটবল আয়ের নয়; তাঁর স্ত্রী ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের তুখোড় ব্যবসায়িক বুদ্ধির অবদানও এখানে অনস্বীকার্য। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় পপ ব্যান্ড ‘স্পাইস গার্লস’-এর সাবেক সদস্য ভিক্টোরিয়া (যিনি ‘পশ স্পাইস’ নামে সমধিক পরিচিত) শুরুতে ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অনেকেই তা নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। তবে সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে তাঁর নিজস্ব ফ্যাশন ব্র্যান্ডটি টানা লোকসান কাটিয়ে এখন বার্ষিক ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি রাজস্ব আয় করা এক লাভজনক পাওয়ার হাউসে রূপান্তরিত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশ্বখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড ‘অ্যাডিডাস’-এর সঙ্গে ডেভিড বেকহ্যামের আজীবন মেয়াদি লাভজনক চুক্তি, নিজস্ব বিভিন্ন স্টার্টআপের লভ্যাংশ এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’-এর লাইসেন্সিং ফি। জিও নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সবকিছুর সমন্বয়েই এই তারকা জুটি আজ বিলিয়নিয়ারের তকমা পেয়েছেন। খেলাধুলা থেকে অবসর নেওয়ার পর কীভাবে মাঠের বাইরের জীবনকে আরও বেশি অর্থপূর্ণ ও লাভজনক করা যায়, ডেভিড বেকহ্যাম এখন তারই এক জীবন্ত বিজ্ঞাপন।