
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দুই অস্ত্রধারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে মিরপুরের শাহ আলী এলাকায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১২ জনকে। তবে দুই ঘটনায়ই হামলার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত শনিবার দিবাগত রাতে নিউগিনি প্রকল্পের কার্যালয় ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এ সময় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাও ভাঙচুর করা হয়। নিউগিনি প্রকল্পের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিয়াকত আলী জানিয়েছেন, হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।
এ ঘটনায় নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। থানা-পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এ মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, হামলার ঘটনায় ডিবি তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের একজন শাহ আলম অনিক, যিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মামুন, আসলাম, মুন্না, মিজানুর রহমান ও শাহরিয়ার মাহমুদ।
পুলিশের ভাষ্য, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তদন্তে হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম এসেছে। তাঁর সম্পৃক্ততা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মামলার ৪ নম্বর আসামি মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনের নিউগিনি প্রপার্টিজের পাশে ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। ওই জমিতে যাতায়াতের জন্য নিউগিনি প্রপার্টিজের রাস্তা ব্যবহার করতে হয় এবং চলাচলের ফটকও তাদের নিয়ন্ত্রণে। এ নিয়ে বিরোধ থেকেই হামলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, মামুন ও মুন্না অস্ত্র নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্তকারীরা এখন ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসেছিল এবং হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল কারা—এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি এক্সক্যাভেটরটি উদ্ধারের জন্যও অভিযান চলছে।
অন্যদিকে, মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি)-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তবে ফেরদৌসী আহমেদ এ ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ রোববার রাতে মো. মিন্টু ও মো. মিলনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরে মালামাল লুট করেন। তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া কিছু মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে মো. সোহেল, মো. জুয়েল, জিহাদ হাসান ও মো. রাব্বিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, টাকার বিনিময়ে তাঁরা ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিলেন।
শনিবার সন্ধ্যায় আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন মো. শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, মো. শাহ আলম, মো. আতিকুর রহমান, মো. কামরুল ইসলাম ও মো. শাকিল। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে শাহবাগ থেকে ডিবি এবং একজনকে শাহ আলী এলাকা থেকে থানা-পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে শাহ আলম সমমনা দোকানদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক।
স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার আগে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যান।
কাছাকাছি একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন লেলিনের কার্যালয়ের সামনে কয়েকজনকে জড়ো হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশের বিভিন্ন মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস চলাচল করতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন সাদা মাইক্রোবাসে করে ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করেন এবং নির্দেশনা দেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হানিফ মিয়ার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান সাম্প্রতিক হামলা-ভাঙচুর ও দখলের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে ভাঙচুর এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার সঙ্গে সরকারি দলের লোকজন বা শক্তিশালী মহল জড়িত বলে শোনা যায়। সে জন্য পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবরে হামলার ঘটনায় মনে হয়েছে দেশ মব সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি। সরকার এমন কোনো বার্তা দিতে পারেনি, যাতে সন্ত্রাসীরা ভয় পায়।’
দুই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি হামলার পরিকল্পনাকারী, নেতৃত্বদানকারী এবং ঘটনাস্থলে এক্সক্যাভেটর নিয়ে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।