
রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক হযরত শাহ আলী (র.) এর মাজারে গভীর রাতে একদল যুবকের অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে লাঠিসোঁটা ও পাইপ নিয়ে একদল লোক মাজার প্রাঙ্গণে ঢুকে সেখানে অবস্থানরত ভক্ত ও জিয়ারতকারীদের ওপর চড়াও হয়। নির্বিচারে চালানো এই লাঠিপেটায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং মাজারের মুরিদ ও ভক্তদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই হামলার কারণ ও ধরন নিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয়দের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মাজারের পাশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়, যেখানে মাঝেমধ্যে কিছু মানুষ আড্ডা দিতেন। মাজারের পবিত্রতা ও পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ তুলে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের কিছু নেতাকর্মী ‘তৌহিদী জনতা’র নাম দিয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে এই হামলা চালায়। অবশ্য এই ঘটনার পরদিন শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
হামলার একাধিক ভিডিওচিত্র ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল উগ্র যুবক লাঠি দিয়ে মাজারে থাকা সাধারণ মানুষকে মারধর করতে করতে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে জোরপূর্বক বের করে দিচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল লাঠি ও পাইপ হাতে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করে। হামলাকারীদের মধ্যে টুপি-পাঞ্জাবি পরা ২০-২২ বছর বয়সী এক যুবকের পিঠে কালো রঙের ব্যাগ ঝোলানো ছিল। সেই যুবকই মূলত ‘তৌহিদী জনতা’র নামে স্লোগান দিচ্ছিল এবং জড়ো হওয়া জনতাকে মাজারে হামলার জন্য উসকানি ও নির্দেশ দিচ্ছিল। নির্দেশ পাওয়ার পরই পুরো দল বিনাবিচারে মারধর শুরু করে। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মাজারের ভেতর লাল রঙের পাঞ্জাবি পরা আনুমানিক ৪০-৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা মুরিদ ও জিয়ারতকারীদের টেনেহিঁচড়ে বের করে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এই তাণ্ডব চলার সময় ভক্তদের রক্ষার্থে সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
তবে এই হামলার ঘটনাটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “মাজারে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। সেখানে গত রাতে রওজার পাশে কয়েক জন বহিরাগত নারী-পুরুষ মাদক সেবন করছিল। স্থানীয়রা দেখে তাদের বের করে দেয়।”
অন্যদিকে, ওসির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ডিএমপির দারুসসালাম জোনের সহকারী কমিশনার এমদাদ হোসেন বলেন, “মাজার প্রাঙ্গণে মাদক বিক্রি ও সেবনরোধে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অভিযান চালিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, গত সপ্তাহেও একই স্থানে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার নেতৃত্বে অনুরূপ একটি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
পুলিশের অভ্যন্তরেই যখন বক্তব্য নিয়ে এমন বৈপরীত্য, তখন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক সরকার জানান, মাজার কর্তৃপক্ষের একটি লিখিত অভিযোগ পুলিশের কাছে দেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”