
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ঘাতককেও পিটিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনতা। ফলে পাঁচ প্রাণহানির এই ঘটনায় হত্যার রহস্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এখনো হত্যাকাণ্ডের কারণ জানা যায়নি। একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় জেলাজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দেশজুড়েও এ ঘটনা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড, সেটিই এখন সবার প্রশ্ন। তবে পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
জানা যায়, সাত বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল মারা যান। এরপর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার পৌর শহরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন শাহিনুর। স্বামীহারা এই মায়ের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সন্তানদের নিয়ে গড়া স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় বৃহস্পতিবার সকালে ঘাতকের হামলায়। একই ভবনের সাবেক এক ভাড়াটিয়া অন্তর মজুমদার মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেন। চিৎকার শুনে স্থানীয়রা ভবন ঘিরে ফেলেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্তরকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেঝো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে ঘটনাস্থলের ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। ঘাতক অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে বলে জানা গেছে। কয়েক মাস আগে তিনি একই ভবনে ভাড়া থাকতেন এবং ফল বিক্রির কাজ করতেন। এ ঘটনায় বেঁচে থাকা পরিবারের একমাত্র সন্তান সিফাত এখন পুরোপুরি বাকরুদ্ধ।
কাঁদতে কাঁদতে কখনো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছেন, কখনো জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন সিফাত। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কর্মস্থলের মালিকসহ স্বজনরা।
শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে একই পরিবারের চার সদস্য এবং গণপিটুনিতে নিহত অন্তর মজুমদারের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, অন্তর মজুমদারের মরদেহ নিতে এ পর্যন্ত তার কোনো স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তি আসেননি। তার মরদেহ সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে নিহত মা ও তিন মেয়ের মরদেহ রায়পুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মরদেহ নিতে কুমিল্লা থেকে শাহিনুর বেগমের শ্বশুর ও দেবর আসেন।
এদিকে নিহত মা ও তিন মেয়ের জানাজা শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় রায়পুর শহরের ধানহাটা এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রায় দুই হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে তাদের মরদেহ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হোক।
নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে সিফাত জানান, প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। সকাল ৯টার দিকেও মুঠোফোনে মায়ের সঙ্গে তার কথা হয়। মা জানতে চেয়েছিলেন তিনি নাশতা করেছেন কি না। তিনি বলেন, ‘মা শুধু জিজ্ঞেস করছিল নাশতা খাইছি কি না। আমি বলছি, খাইছি। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। পরে খবর পেয়ে বাড়ি এসে দেখি সব শেষ।’ সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে তাদের কোনো পূর্ববিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
সিফাতের কর্মস্থলের মালিক ও রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ঘরের ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মেঝেজুড়ে রক্ত, মা ও তিন মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সিফাত আমার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ছেলেটা খুবই ভদ্র ও পরিশ্রমী। সামান্য বেতনে চাকরি করে পরিবারের হাল ধরার চেষ্টা করছিল। এক দিনেই সে তার মা ও তিন বোনকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমরা জানতে চাই, এ ঘটনায় শুধু অন্তর জড়িত ছিল, নাকি তার সঙ্গে অন্য কেউও জড়িত ছিল। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণও জানতে চাই।’
লাশ নিতে আসা শাহিনুর বেগমের দেবর সদর হাসপাতালের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ভাবি ও ভাতিজিরা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কেন তাদের খুন করা হলো, তারা তো কারও কোনো ক্ষতি করেননি।
শাহিনুর বেগমের শ্বশুর দাদন মিয়া বলেন, সর্বশেষ কোরবানির ঈদের পর তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। এখন এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. অরূপ পাল বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন পাওয়ার পর সবার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, এ ঘটনায় নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে সিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।