
কৃষিজমির মাটিই যখন জীবিকার ভরসা, তখন সেই জমির ‘টপ সয়েল’ কেটে বিক্রি করছেন রংপুরের বহু কৃষক। এতে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল তুলে নেওয়ার অভিযোগে রংপুর জেলার তারাগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলায় কয়েকজনকে জরিমানা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
কৃষিবিদরা বলছেন, ফসলি জমির উপরের স্তর বা ‘টপ সয়েল’ মাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্তরেই জৈব উপাদান ও পুষ্টি সবচেয়ে বেশি থাকে। একবার এই মাটি তুলে নিলে জমির উর্বরতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ১০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
তবে বাস্তবে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি থেকে এই মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইটভাটার মালিকেরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এই মাটি কিনছেন। প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল থাকায় কোথাও কোথাও কৃষিজমির মাটি কাটার প্রতিযোগিতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাৎক্ষণিক অর্থের লোভে কৃষকরা মাটি বিক্রি করলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি অনেকেই বিবেচনায় নিচ্ছেন না।
মিঠাপুকুর উপজেলার কৃষক মিনহাজ মিয়া জানান, তাঁর আবাদি জমির দুই পাশের দুই কৃষক তিন বছর আগে নিজেদের জমির মাটি বিক্রি করেছিলেন। ফলে সেসব জমি এখন চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর হয়ে গেছে। এতে তাঁর জমি তুলনামূলক উঁচু হয়ে আছে এবং বেশি বৃষ্টি হলে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই উপজেলার কৃষক কুতুব আলী বলেন, গত বছর তাঁর পাশের জমির মালিক ইটভাটায় মাটি বিক্রি করায় তাঁর জমি উঁচু হয়ে যায়। এবার তিনি বাধ্য হয়ে নিজেও ইটভাটায় মাটি বিক্রি করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইটভাটার মালিক প্রতি গাড়ি মাটির জন্য ৩০০ টাকা করে দিচ্ছেন।
ইটভাটার মালিকদের দাবি, কৃষকরা স্বেচ্ছায় মাটি বিক্রি করছেন। তাঁদের মতে, ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাই মাটি বিক্রিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
পীরগাছা উপজেলার কৃষক মইনুল করিম বলেন, এক বিঘা জমির টপ সয়েল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। শুরুতে লাভজনক মনে হলেও পরের বছর বা একাধিক মৌসুম ধরে ভালো ফলন পাওয়া যায় না।
রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাফিনুর রহমান বলেন, “টপ সয়েলে জৈব উপাদান ও অণুজীব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই মাটি একবার সরিয়ে নিলে জমির উর্বরতা ফিরতে এক দশকের বেশি সময় লাগে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরি-স্তর কাটলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এ জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।”
প্রতি বছর আমন মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগজনক হারে কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে ফসলি জমির মাটি বিক্রির প্রবণতা অত্যন্ত ভয়ংকর। এটি কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে ফসলের উৎপাদন কমবে, অধিক চাষাবাদ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে না এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে।