
মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং দেশটির চলমান পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাপানের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ইউনূস সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক
বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতি, মিয়ানমারের চলমান সংকট, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাব্য বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
এর আগে সোমবারও সাসাকাওয়া বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক উত্তরণ, রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট এবং দুই দেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সাক্ষাতে জাপান ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন ইয়োহেই সাসাকাওয়া। একই সঙ্গে তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের দর্শন ও নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
সাসাকাওয়া বলেন, সম্পদের কেন্দ্রীভবন বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি দেশের একক প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ কারণে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাসাকাওয়ার ভূমিকা
মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সাসাকাওয়ার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এবং অভিজ্ঞতার বিষয়টি উঠে আসে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমারে শান্তি ও সংলাপ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ইয়োহেই সাসাকাওয়া ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি প্রজন্ম যদি নিজেদের সুস্পষ্ট আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা ছাড়াই বেড়ে ওঠে, তাহলে তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ সময় সাসাকাওয়া জানান, তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন। সেখানে গিয়ে মানবিক সহায়তার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোও তিনি খুঁজে দেখবেন।
গভীর সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগ
বৈঠকে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়।
অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের উপকূলীয় সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, উন্নত বন্দর অবকাঠামো এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় সামাজিক ব্যবসা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শিক্ষা নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই পক্ষ।
অধ্যাপক ইউনূস তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি না করে উদ্যোক্তা ও চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী নতুন শিক্ষাপদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এ সময় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়।
পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক শান্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ খুঁজে বের করার বিষয়েও তারা সম্মতি প্রকাশ করেন।
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
বৈঠকে গ্রামীণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান এবং ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।
ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে থাকা প্রতিনিধি দলে ছিলেন শোতা নাকায়াসু, ফ্রাঞ্জ কেন কুরিবায়াশি, তোরু কিমুরা, কিমিয়ো মাচিদা, ড. আকিকো হোরিবা, ড. নাওনোরি কুসাকাবে এবং ড. শিহো তানাকা।