
বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারের তৎপরতা আগের তুলনায় বাড়লেও পাচারকারীদের দণ্ডিত করার হার কমেছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত মানব পাচার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে মানব পাচারের ঘটনা ব্যাপকভাবে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট ২০২৬’-এ বাংলাদেশের মানব পাচার পরিস্থিতি নিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচার নির্মূলে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে এ অপরাধ মোকাবিলায় সরকার উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আগের প্রতিবেদনকালীন সময়ের তুলনায় সামগ্রিক উদ্যোগ বাড়ায় বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তরে (টিয়ার-২) রাখা হয়েছে।
আইন সংশোধন ও তদন্তে অগ্রগতি, বেড়েছে সমন্বিত সেবার উদ্যোগ
মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৬ প্রণয়ন। নতুন এই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে মানব পাচার মোকাবিলার ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এ-সংক্রান্ত তদন্ত ও মামলা পরিচালনার সংখ্যা বাড়ানো এবং মানব পাচারের অপরাধ শনাক্তকরণ ও ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করার নির্দেশিকা হালনাগাদ করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন সেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থার (এনআরএম) ডিজিটাল সংস্করণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করে মানব পাচারের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ভুক্তভোগী শনাক্ত ও পুনর্বাসনে ঘাটতি, ঋণের বোঝায় বাড়ছে ঝুঁকি
সরকারের উদ্যোগ বাড়লেও মানব পাচার মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের তুলনায় এবার কমসংখ্যক ভুক্তভোগী শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং সমাজে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
বিদেশে চাকরি পেতে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়োগসংক্রান্ত ফি আদায়ের প্রচলিত ব্যবস্থাও অব্যাহত রয়েছে। এসব ফি দিতে গিয়ে অনেক শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আর্থিক এই চাপ তাঁদের মানব পাচারের ঝুঁকিতে আরও বেশি ঠেলে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত মানব পাচার প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পাচারকারীদের দণ্ডিত করার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।
পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্রের
মানব পাচারকে স্বাধীনতা ও মর্যাদার মৌলিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র থমাস টমি পিগট।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার যে মূল্যবোধ যুক্তরাষ্ট্রের পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি, মানব পাচার তার পরিপন্থী। ২০২৬ সালের মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে অপরাধী সংগঠন ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থাগুলো কীভাবে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে এ ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটনের নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মানব পাচারকারীদের শাস্তি দিতে এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ সরকারগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
পিগট বলেন, মানব পাচারকারী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করতে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের উপলভ্য উপায় ব্যবহার করবে।