
বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যকার চলমান উত্তেজনা ও নানামুখী বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বেইজিং ত্যাগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরের দিকে বেইজিং ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ট্রাম্পকে বহনকারী বিশেষ বিমান 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং কিছু সমস্যার সমাধানও মিলেছে। তবে তাইওয়ান সংকট, ইরান ইস্যু এবং বাণিজ্য সংঘাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
ইরান ও হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গ
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইরান সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প জানান, তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে—এই নীতিগত বিষয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটন একমত পোষণ করেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নিজের খোলামেলা অবস্থান ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি সচল রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বেশ সীমিত, অন্তত চীনের যতটা অর্থনৈতিক প্রয়োজন রয়েছে, আমেরিকার ততটা নেই।
অন্য দিকে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে "যুদ্ধ কখনোই হওয়া উচিত ছিল না"।
শি ও ট্রাম্পের মূল্যায়ন এবং ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ
এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেন। শি জিনপিং বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার মহান করতে চান, আর আমি চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
দুই নেতার এই আলোচনার মাধ্যমে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গঠনমূলক ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন শি। একই সঙ্গে বৈঠকে যেসব বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো দ্রুত কার্যকরের তাগিদ দেন তিনি।
বসে ছিলেন না ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি এই সফরকে ‘অত্যন্ত সফল, বিশ্বখ্যাত ও অবিস্মরণীয়’ বলে বর্ণনা করেন। শি জিনপিংকে নিজের একজন পুরোনো ও দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। একই সঙ্গে শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউজে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে স্বাগত জানাতে তিনি উন্মুখ হয়ে আছেন বলেও জানান।
তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের কড়া হুঁশিয়ারি
সফরের সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর অধ্যায় ছিল তাইওয়ান ইস্যু। আলোচনার টেবিলে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে ভবিষ্যতে "অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি" তৈরি হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
চীনের প্রেসিডেন্টের এই কড়া বার্তার জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি আগামী দিনে বৈশ্বিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।