
গাজায় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও ভয়াবহ গণহত্যা চালানোর দায়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচিত দেশ ইসরায়েল এবার দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার। তবে চিরচেনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এই গুরুতর দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি দূত দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের আকস্মিক অভিযানের পর থেকেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এই সংগঠনের সামগ্রিক গতিবিধি এবং ‘কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে’ তেল আবিব।
এনডিটিভির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এডিটর আদিত্য রাজ কাউলকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে রিউভেন আজার আঞ্চলিক কূটনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন। সেই সাথে চরমপন্থা দমনে ইসলামাবাদের সদিচ্ছা ও সততা নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা নিরসনে এবং শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আজার স্পষ্ট জানান, ইসরায়েল পাকিস্তানকে ‘বিশ্বাস করে না’ এবং তাদের এই কূটনৈতিক অবস্থান ও তৎপরতাকে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে’ মূল্যায়ন করে।
আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ইসরায়েল এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার মধ্যে মৌলিক ও আকাশপাতাল পার্থক্য রয়েছে দাবি করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ কাতারের আঞ্চলিক ভূমিকারও তীব্র সমালোচনা করেন। সাক্ষাৎকারে রিউভেন আজার বলেন, "এমন কিছু দেশ আছে যারা মনে করে, শান্তি মানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।"
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো সাক্ষাৎকারে রিউভেন আজারের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও প্রধান দাবিটি ছিল হামাসের কথিত নেটওয়ার্ক নিয়ে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হামাসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি।"
তার দাবি, এই তৎপরতার কিছু তথ্য ‘প্রকাশ্যে’ পাওয়া গেলেও আরও অনেক অন্তর্ঘাতী কর্মকাণ্ড জনসম্মুখে নাও থাকতে পারে। হামাস যেভাবে অতর্কিতে ইসরায়েলে সামরিক কায়দায় নজিরবিহীন হামলা করেছিল, দক্ষিণ এশিয়ার ‘চরমপন্থি’ সংগঠনগুলো সেই একই রণকৌশল বা মডেল অনুসরণ করে অন্য কোথাও বড় ধরনের হামলার ছক কষতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেন এই ইসরায়েলি কূটনীতিবিদ।
আজার আরও বলেন, এ ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি এই অঞ্চলের সার্বভৌম সরকারগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। এই স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ইস্যুতে তারা ইতিমধ্যে ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিজেদের গভীর উদ্বেগের কথা শেয়ার করেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের সরকারি মহলের একাংশের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘ইহুদিবিদ্বেষী বয়ান’ ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোরও সরাসরি অভিযোগ আনেন তিনি। তার ভাষায়, পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য ইসরায়েল ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি ইসলামাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ‘ম্লান করে দেয়’।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণের পর গাজায় নির্বিচার ও সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের নামে চরম আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। হামাস নির্মূলের খোঁড়া অজুহাতে সেখানে নারী, শিশু ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যা চালানোর গুরুতর অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে ইসরায়েলকে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী অভিযানে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই নিরীহ নারী ও শিশু।
গাজার এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ওই বছর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত 'ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে' (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যার মামলা দায়ের করে দক্ষিণ আফ্রিকা। পরবর্তীতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার এই ঐতিহাসিক আইনি পদক্ষেপকে সরাসরি সমর্থন জানায়। আন্তর্জাতিক আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, ফিলিস্তিনিদের আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে জাতিগতভাবে ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী ও সুনির্দিষ্ট 'উদ্দেশ্য' নিয়েই ইসরায়েল গাজায় এই বর্বর সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে, যা ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক 'জেনোসাইড কনভেনশন'-এর স্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিশ্বনেতাদের চাপে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী ও চোরাগোপ্তা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আরও সহস্রাধিক ফিলিস্তিনির মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া, অবরুদ্ধ গাজার মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও হাজার হাজার মানুষের মরদেহ এখনো আটকে আছে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে।