.jpeg)
শিক্ষার্থীদের পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম।
শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদায়লগ্নে প্রিয় উপাচার্যকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের যেমন আবেগ উপচে পড়ে, তেমনই নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি উপাচার্য নিজেও। বিদায়ের এই ক্ষণে কোনো বিলাসবহুল গাড়ি নয়, চোখ মুছতে মুছতে নিজের চিরচেনা মোটরসাইকেলে চড়ে একাই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নেন এই সাদামাটা মানুষটি।
উপাচার্যের এমন নজিরবিহীন ও মানবিক বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট ও স্মৃতিচারণ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
রবিউল শিকদার নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে উপাচার্যের সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। এমন সাদামাটা মানুষ আসলে পাওয়া কঠিন, যার মধ্যে কোনো প্রশাসনিক দাম্ভিকতা ছিল না, ছিল না কোনো বাড়তি সুবিধা নেওয়ার লোভ। তবে প্রথম থেকে তাঁর এই অতিরিক্ত সহজ-সরল রূপটি আমার পুরো পছন্দ ছিল না। হয়তো তাঁর এই অতি সরলতার সুযোগ নিয়েই শিক্ষকরা তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার সাহস পেয়েছিল। পরিশেষে স্যার, আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন।
শাহাদাত নামের আরেক শিক্ষার্থী তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছেন, তিনি যেমন একা এসেছিলেন, হয়তো নিজের মতো করে ভালো কিছু করার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি যোগ্য কোনো সঙ্গী পাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি একাই বিদায় নিলেন। যোগ্যতার চুলচেরা বিশ্লেষণে যাব না, তবে মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত খাঁটি ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছিলেন। ভালো থাকবেন স্যার।
এদিকে উপাচার্যের অনন্য মানবিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার এক চমৎকার গল্প তুলে ধরেছেন সিমান্ত নামের এক শিক্ষার্থী। নিজের হারিয়ে যাওয়া পোষা বিড়ালকে কেন্দ্র করে উপাচার্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, একদিন আমার পোষা বিড়ালটি হারিয়ে গেলে আমি সরাসরি ভিসি স্যারের রুমে যাই। যেহেতু স্যারের নিজেরও বিড়াল ছিল এবং তিনি এর আগে ক্যাম্পাসে আমার বিড়ালটিকে বহুবার কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন, তাই আমি সাহস করে উনাকে বলি, স্যার, সবাই তো আপনার কাছে একাডেমিক দাবি নিয়ে আসে, আমি একটি ব্যক্তিগত দাবি নিয়ে আসছি। বলতে ভয় হচ্ছে, তাও বলছি স্যার।
সিমান্ত আরও লিখেছেন, এরপর আমি স্যারকে একটি ভিডিও দেখাই, যেখানে উনি নিজে ১১ চত্বরে বসে আমার বিড়ালটিকে আদর করছিলেন। আমি উনাকে জানাই যে আমার বিড়ালটি হারিয়ে গেছে। সব শুনে স্যার তাৎক্ষণিক নিজ থেকেই বলে উঠলেন, তোমার কি বিড়াল লাগবে? আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে উনি পরম মমতায় বললেন, আমার বিড়ালগুলো তো এখনো ছোট বাচ্চা। এখন মায়ের কাছ থেকে আলাদা করলে ওরা কষ্ট পাবে। তুমি এক মাস পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো, ওরা একটু বড় হোক। এরপর যখন আমি রুম থেকে বের হচ্ছি, তখন উনি আবার ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন রঙের বিড়ালটা তোমার পছন্দ? এরপর আমি সালাম দিয়ে চলে আসি। ভেবেছিলাম ঈদের পর যোগাযোগ করব। কিন্তু এর কয়েকদিন পরই স্যার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উনাদের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমাকে খুঁজে বের করার জন্য বার্তা পাঠান। একজন উপাচার্য হয়েও শিক্ষার্থীর বিড়াল হারিয়ে যাওয়ার কষ্টে নিজের শখের বিড়াল উপহার দিতে উন্মুখ হয়ে খোঁজাখুঁজি করছেন, এই বিষয়টি যে কতটা সুন্দর ও মানবিক, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
ক্যাম্পাসের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সিমান্ত লিখেছেন, উনি ক্যাম্পাসে কতটুকু করতে পেরেছেন বা পারেননি, তা নিয়ে আমি কথা বলব না। অনেক ভিসি তো এলেন আর গেলেন, কে কয়টা বিল্ডিং বানিয়েছেন তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু উনার মতো এত ফ্রেন্ডলি এবং বন্ধুবৎসল একজন মানুষ আর কখনো পাওয়া যাবে কি না, তা আমার জানা নেই।
প্রশাসনিক চেয়ারের কঠোরতা ছাপিয়ে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে একজন পথপ্রদর্শক ও সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবে যে স্থান করে নিয়েছেন, এই অশ্রুসিক্ত বিদায় তারই এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে।