
যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে ফুটবল মাঠ থেকে কার্যত ছিটকে পড়েছে ইরান, আর সেই সঙ্গে তৈরি হয়েছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বড় অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর দেশটির ক্রীড়া কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় জুনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরান শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ালে তাদের জায়গা কে নেবে, তা নিয়েই এখন ফুটবল মহলে জোর আলোচনা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতে ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে সব ধরনের খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে। ফলে ফুটবলারদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিও থমকে আছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর অনেক ইরানি নাগরিকও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার বিরোধিতা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমেদ দোনিয়ামালি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান অবস্থায় জুনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “এই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার (যুক্তরাষ্ট্র) আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে, সেটি বিবেচনা করে কোনো অবস্থাতেই আমরা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারি না।”
ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানেই অটল থাকে, তাহলে ৪৮ দলের বিশ্বকাপে তাদের পরিবর্তে কোন দেশ সুযোগ পাবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এশিয়ার দুটি দেশ ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সামনে আসছে। একই সঙ্গে ইউরোপের শক্তিশালী দল ইতালির কথাও আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের সিদ্ধান্ত ফিফার জন্যও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যদিও দুই দিন আগে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে ইরান বিশ্বকাপে খেলবে। গত বুধবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তার আলোচনা হয়েছে। সেখানে ইনফান্তিনো লিখেছিলেন, “আমরা ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছি এবং বিষয়টা হলো, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে ইরান। ওই আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে এই টুর্নামেন্টে অবশ্যই ইরান দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।”
তবে ফিফার এই আশাবাদের পরপরই ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও এখনও পর্যন্ত ইরান সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত পায়নি ফিফা। তবু সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিকল্প ভাবনাও শুরু করেছে সংস্থাটি।
আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে বিশ্বকাপের মতো বড় আসর থেকে কোনো দেশের সরে দাঁড়ানোর নজির প্রায় নেই বললেই চলে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিফার সাবেক ফুটবল রেগুলেটরি পরিচালক জেমস কিচিং বলেন, “ফুটবলের আধুনিক যুগে এমন ঘটনার নজির নেই। ফিফার টুর্নামেন্ট আইন অনুযায়ী, কোনো দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালে তাদের জায়গায় ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে সংস্থাটির। এর অর্থ হলো, উদাহরণস্বরূপ কোনো দল সরে দাঁড়ালে তাদের জায়গায় একই অঞ্চল থেকে আরেক দল আনতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আবার এমনও নয় যে, তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ করতেই হবে।”
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল সরে দাঁড়ালে তাদের গ্রুপের রানার্সআপ অথবা সংশ্লিষ্ট মহাদেশে বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংধারী দলকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে যারা সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা পায়নি, তাদের মধ্যে বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যাদের অবস্থান ৬৮। ফলে ইরান না খেললে সরাসরি আমিরাতকে সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরাক, যাদের র্যাঙ্কিং ৫৮, এই মাসে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়া বা সুরিনামের বিপক্ষে খেলবে। চাইলে ফিফা সরাসরি ইরাককে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্লে-অফে জায়গা পেতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আরেকটি আলোচিত বিকল্প ইতালি। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া দলগুলোর মধ্যে ইতালির অবস্থান সবচেয়ে ওপরে, বর্তমানে তারা আছে ১৩ নম্বরে। তবে তাদের সরাসরি বিশ্বকাপে নেওয়া হলে প্লে-অফ কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে, যা জটিলতা ও বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
গত বছরের ডিসেম্বরের ড্রয়ে ইরানকে বেলজিয়াম, মিসর ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ ‘জি’-তে রাখা হয়েছিল। তাদের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইরান যদি সত্যিই টুর্নামেন্টে অংশ না নেয়, তাহলে অনেকের মতে সেই শূন্যতা পূরণে এশিয়া মহাদেশ থেকেই আরেকটি দলকে সুযোগ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে।