
তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ এখন এক রোমাঞ্চকর মোড় নিয়েছে। অভিনেতা ‘থালাপতি’ বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কালাগাম (টিভিকে) সর্বোচ্চ আসন পেলেও ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে না পারায় সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। আর এই সুযোগেই বিজয়ের জয়রথ থামাতে কয়েক দশকের শত্রুতা ভুলে এক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি— ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে।
চিরশত্রুদের নজিরবিহীন গোপন বৈঠক
ইন্ডিয়া টুডে ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজয় যখন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই নেপথ্যে আলোচনা শুরু করেছে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে এবং পালানিস্বামীর এআইএডিএমকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেস-সমর্থিত বিজয়ের উত্থান ঠেকাতেই তামিলনাড়ুর এই দুই পুরনো দ্রাবিড় শক্তি নিজেদের মধ্যকার বৈরিতা পাশে সরিয়ে রাখার কথা ভাবছে।
সূত্র জানিয়েছে, এআইএডিএমকে-কে সরকার গড়ার সুযোগ দিয়ে ডিএমকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে— এমন একটি ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা চলছে। ডিএমকে নেতা এসএএস হাফিজুল্লাহর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা যে খবর শুনতে চলেছেন, সেটি তামিলনাড়ু ও গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে।’
গাণিতিক জটিলতা ও রিসোর্ট রাজনীতি
নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, ডিএমকে ৫৯টি এবং এআইএডিএমকে ৪৭টি আসন পেয়েছে। এই দুই দল এক হলেও তাদের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৬, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ থেকে ১২ কম। ফলে এই জোট বাস্তবায়িত হলেও তাদের পিএমকে, সিপিএম বা সিপিআই-এর মতো ছোট দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে।
এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দল ভাঙন রোধে এআইএডিএমকে তাদের প্রায় ৫০ জন বিধায়ককে পুদুচেরির একটি রিসর্টে সরিয়ে নিয়েছে।
কংগ্রেসের ভূমিকা ও স্ট্যালিনের ক্ষোভ
এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মূলে রয়েছে কংগ্রেসের অবস্থান। শুরুতে স্ট্যালিনকে পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও রাহুল গান্ধীর দল শেষ পর্যন্ত বিজয়কে সমর্থন জানানোয় ক্ষুব্ধ ডিএমকে নেতৃত্ব। ডিএমকে-র এক প্রবীণ নেতার ভাষ্যমতে, ‘আমি আপনার পাশেই আছি।’ — রাহুল গান্ধী বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনকে ফোনে এই আশ্বাস দিলেও পরদিনই টিভিকে-কে সমর্থন জানায় কংগ্রেস।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়?
১৯৭২ সালে দুর্নীতির অভিযোগে এমজিআর-কে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন করুণানিধি, যার ফলে জন্ম হয়েছিল এআইএডিএমকে-র। সেই থেকে এই দুই দলের দা-কুমড়ো সম্পর্কই ছিল তামিল রাজনীতির পরিচিত রূপ। তবে এখনকার পরিস্থিতি বলছে, নতুন শক্তির উত্থান রুখতে পুরনো শত্রুরাও বন্ধু হতে পারে।
তামিল রাজনীতির অন্দরমহলে এখন একটাই প্রশ্ন— ‘যদি বিজয় ব্যর্থ হন, তবে কী?’ দুই শিবিরের একটি সূত্রের দাবি, ‘বিজয় সফল হলে সরকার চালাবেন। আর যদি ব্যর্থ হন, তাহলে বৈধভাবেই অন্য কোনো বিকল্পের পথ সুগম হবে।’
এখন দেখার বিষয়, থালাপতি বিজয় কি পারবেন এই কঠিন রাজনৈতিক ব্যূহ ভেদ করে মসনদে বসতে, নাকি দুই দ্রাবিড় শক্তির কৌশলের কাছে হার মানবেন তিনি।