
তরুণদের নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ প্রকল্প ‘উদ্যোগ’ (UDYOG) চালু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর এ প্রকল্পের বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে সার্কুলার জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করে তা ফেরত দেওয়ার পর উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে দেশের আট বিভাগের একটি করে জেলা বেছে নিয়ে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হবে। এসব জেলার আওতাধীন ৬৪টি উপজেলার তরুণদের এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ বছর।
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য ও পশুপালন থেকে শুরু করে পর্যটন, সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও স্টার্টআপ—তরুণদের সব ধরনের সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণাই ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় বিবেচনা করা হবে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘‘প্রকল্পের অধীনে সব জেলা ও উপজেলাতেই তরুণ সমাজ যারা বিভিন্ন আইডিয়া, যাদের মাথায় সবসময় আইডিয়া খুরপাক খায় সেই আইডিয়াকে কিভাবে বাস্তবে রূপ দেয়া যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক বা অন্যান্য অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা এই উদ্যোগ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা আটটি বিভাগের আটটি জেলাকে সিলেক্ট করেছি। এই জেলার অধীনে থাকা ৬৪০ উপজেলার তরুণদের ঋণ সহায়তা দিতে পারবো। আর্থিকভাবে সহায়তা করব, প্রয়োজনে ক্রেডিট প্লাস প্লাস অর্থাৎ মার্কেটিং টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে থাকবো।’’
প্রথম ধাপে একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। উদ্যোক্তা সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করে নির্ধারিত নিয়মে ঋণের মূল টাকা ফেরত দিলে পরবর্তী ধাপে তাকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে।
ঋণের গ্রাহক পর্যায়ের সুদের হার ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান রিফাইন্যান্স স্কিম থেকে।
সার্কুলারে প্রকল্পের ঋণ ও অনুদান পাওয়ার বিস্তারিত শর্ত উল্লেখ থাকবে জানিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘আমরা প্রথমে পুরোটা ঋণ আকারেই দিব। যখন এই ঋণের সৎ ব্যবহার ও আমাদের কাছে মূল টাকাটা ফেরত আসবে। তখনই আমরা অনুদান ধার্য করব। সব বাস্তবায়ন ছাড়া অনুদান দেয়ার সুযোগ নেই।’’
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সার্কুলার জারির পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রায় এক মাস আবেদন গ্রহণ করবে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৫ হাজার তরুণকে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার উদ্যোগ
উপজেলা পর্যায়ে ‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের ঋণ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভাগীয় পর্যায়ে আমাদের যে আচলিক অফিসগুলো আছে, তারা এটা মনিটর করবে। সর্বোপরি ব্যাংকগুলো এর সাথে অতপ্রভাবে জড়িত থাকবে। এইটা যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবেই ঋণগুলো বিতরণ ও ব্যবহার হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেওয়া যাবে না। আবার একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তার যদি কোন রাজনৈতিক পরিচয় থাকে, তবে সেই পরিচয়টা তার ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন বাধা হিসেবে দাঁড়াবে না। মূলকথা যিনি প্রতিভাবান হিসেবে সিলেক্টেড হবেন, তাকেই এই সুবিধা প্রদান করা হবে।’’
ঋণের অর্থ নির্ধারিত ব্যবসার বাইরে অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে, সংবাদ সম্মেলনে তা বিস্তারিত জানানো হয়নি।
৮ জেলার ৬৪০ তরুণ পাবেন সুযোগ
‘উদ্যোগ’ প্রকল্পের প্রথম ধাপে দেশের আট বিভাগ থেকে আটটি জেলা নির্বাচন করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো—মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা।
নির্বাচিত আট জেলার ৬৪টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তা বাছাই করা হবে। ব্যাংক, বিভিন্ন চেম্বার সংগঠন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে।
এর আগে গত ১১ আগস্ট ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
বৈঠক শেষে এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘‘যাদের বয়স ২৫, ২৬, ২৭-২৮ এর মধ্যে তাদেরকে আমরা ব্যাংকগুলো রিফাইনান্স নিয়ে সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে খুব কম রেটে ৪, ৫, ৬ পারসেন্ট রেটে আমরা লোন দিব।’’
এ সময় গ্রান্ট হিসেবে দেওয়া ১০ লাখ টাকা ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানানো হয়েছে, বিএনপির রাজনৈতিক ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তার আলোকে উপজেলা পর্যায়ে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিএনপির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।