
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিগত সাড়ে ১৫ বছরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা ঢেলে সাজাতে ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি এবং দাপ্তরিক কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার বড় পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সরাসরি সিন্ডিকেটের এসব কঠোর ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার উপাচার্যের উপস্থিতিতে ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্তগুলো অনুমোদন পায়।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সংঘটিত সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখতে প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী তদন্ত প্যানেল তৈরি করেছে সিন্ডিকেট। এতে বিভিন্ন অনুষদের ডিনগণ সদস্য হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
পাশাপাশি, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক গবেষণা প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও সঠিকতা বিচারে প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেসানীকে প্রধান করে পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিগত ১৫ বছরে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বরাদ্দকৃত অর্থে পরিচালিত ‘হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের’ আওতাধীন সব গবেষণা প্রকল্পের আয়-ব্যয় নিরপেক্ষভাবে অডিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানে যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গিয়ে দমন-পীড়নে সমর্থন দিয়েছিলেন, তাদের অভিযোগ তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ তৈরি করতে ৪ সদস্যের এক বিশেষ প্যানেল গঠিত হয়েছে। উপাচার্য নিজে, দুজন প্রো-ভিসি এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান এই প্যানেলে থেকে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন।
এই বিশেষ প্যানেল মূলত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক’ প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ১২৫ জন অভিযুক্ত শিক্ষকের তালিকা এবং তাদের অপরাধের মাত্রা বিশ্লেষণ করবে। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'অভিযুক্ত কোনো শিক্ষকরা যদি কোনো শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তবে সেই সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত করা হবে।'
অন্যদিকে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সিন্ডিকেট সভা চলাকালে ভিসি অফিসের বাইরে ডাকসু, বিভিন্ন হল সংসদ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা একযোগে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল—অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলে সিট পাওয়ার মেয়াদ বাড়াতে সিন্ডিকেটের প্রস্তুতকৃত নতুন নীতিমালা যেন কোনোভাবেই পাস করা না হয়।
শিক্ষার্থীদের সেই জোরালো প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন সিট বণ্টন নীতি অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। উপাচার্য স্পষ্ট করেন যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সহ সব অংশীজনদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা শেষেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত প্রস্তাব গৃহীত হবে। পাশাপাশি সভা চলাকালে উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার করে বিঘ্ন সৃষ্টকারীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া সভায় জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখা সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে স্থায়ী বহিষ্কারের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে।
একই সভায় নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জন অধ্যাপককে প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং ক্লাস নেওয়া থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। তারা হলেন— ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মুহিত, ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের আবু সারা শামসুর রউফ, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন, পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের ড. রফিক শাহরিয়ার, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আফরোজা শেলী এবং একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।