
খনিজ সমৃদ্ধ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ইতুরিতে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা জাতিগত সংঘাত ও খনি দখলের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় লেন্দু ও হেমা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিশোধমূলক হামলার নৃশংসতা
নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র ও সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত ২৮ এপ্রিল ইতুরির বেশ কয়েকটি গ্রামে হামলা চালায় ‘কোডেকো’ (CODECO) নামক একটি সশস্ত্র জোট। মূলত ‘সিআরপি’ (CRP) নামক আরেকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতেই এই নৃশংসতা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিআরপি নিজেদের হেমা সম্প্রদায়ের রক্ষক দাবি করে পিম্বো এলাকায় কঙ্গো সেনাবাহিনীর (ফারডিসি) ওপর হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এরপর লেন্দু জনগোষ্ঠীর হয়ে লড়াই করা কোডেকো যোদ্ধারা প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
মৃতদেহ উদ্ধার ও মানবিক সংকট
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৯ জন মিলিশিয়া ও সেনা সদস্য রয়েছেন। বাকিরা নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। দিউডোন লোসা নামক এক নেত্রী জানান:
“মাত্র ২৫টি মৃতদেহ দাফন করা হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকটি দেহাবশেষ এখনো উদ্ধার করা বাকি আছে।”
কোডেকো যোদ্ধাদের অবস্থানের কারণে দীর্ঘ সময় এলাকায় প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে মৃতদেহগুলো মাটিতে পড়ে থেকে পচে যাচ্ছিল। মানবিক সহায়তা কর্মীরা বাসা গ্রামের কাছে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন।
অরক্ষিত বেসামরিক জনপদ
কঙ্গোয় জাতিসংঘের স্থিতিশীলতা মিশন (মনুস্কো) জানিয়েছে, ৩০ এপ্রিল তারা লড়াইয়ের মাঝে আটকে পড়া প্রায় ২০০ জনকে উদ্ধার করেছে। এদিকে হেমা সম্প্রদায়ের অলাভজনক সংস্থা ‘এন্টে’ এই ঘটনাকে “গণহত্যা” হিসেবে বর্ণনা করে সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এম২৩ ও এডিএফ-এর মতো বড় বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মোকাবিলা করতে গিয়ে সেনাবাহিনী ব্যস্ত থাকায় স্থানীয় মিলিশিয়ারা সাধারণ মানুষের ওপর হামলার সুযোগ পাচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপদেষ্টা রাওয়িয়া রাগেহ আল জাজিরাকে বলেন:
“কঙ্গোর কর্তৃপক্ষ একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পূর্ব কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র একটি বিশাল এলাকা। এখানে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী রয়েছে – এম২৩, এডিএফ, কোডেকো। উদাহরণস্বরূপ, এডিএফ-এর মতো একটি গোষ্ঠী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এম২৩-এর হুমকি মোকাবিলা করতে গিয়ে বেশিরভাগ বাহিনীই হিমশিম খাচ্ছে।”
ইতিহাস ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট
ডিআরসি-র এই অঞ্চলটি সোনা, হীরা, কোবাল্ট ও ইউরেনিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এই খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতেই গত ৩০ বছর ধরে অন্তত ১২০টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে সক্রিয় রয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে স্বৈরশাসক টমাস লুবাঙ্গার প্রতিষ্ঠিত ‘সিআরপি’ গোষ্ঠীর পুনরুত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তীব্র নিরাপত্তা সংকটের মুখে বর্তমানে ওই জনপদের বেসামরিক মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও এএফপি।