
জীবিত মানুষ অথচ সরকারি নথিতে তিনি এক দশক ধরে 'মৃত'। নির্বাচন কমিশনের একটি মারাত্মক ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে গত ১০ বছর ধরে নিজের ভোটাধিকারসহ সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ফরিদপুরের বাদশা শেখ। নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর লড়াই শেষে অবশেষে মুক্তি মিলল এই অসহায় রিকশাচালকের।
ফরিদপুর পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর সাদীপুর এলাকার বাসিন্দা, মৃত গেন্দু শেখের ছেলে বাদশা শেখ। সংসারে অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
বাদশা শেখের এই দুর্ভোগের শুরু ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। সেবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটার তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাননি তিনি। এরপর থেকে কোনো নির্বাচনেই আর নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মূল তথ্যভান্ডারে তাঁকে মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বাদশা শেখ জানান, "আমি জীবিত, কিন্তু কাগজে-কলমে আমাকে মৃত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমার এনআইডিও ব্লক করে রাখা হয়েছে।"
এই জটিলতার অবসান ঘটাতে সম্প্রতি ফরিদপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যান বাদশা। সেখানে নিজের ছবিসহ মূল জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুরাহা মেলেনি। উল্টো নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁকে স্থানীয় পৌরসভা থেকে একটি 'জীবিত থাকার প্রত্যয়নপত্র' বা জীবন সনদ নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। কর্মকর্তাদের কথা অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ জুন ফরিদপুর পৌরসভা থেকে জীবিত থাকার সনদ সংগ্রহ করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেন তিনি।
নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে বাদশা শেখ বলেন, "প্রতিদিন কাজ না করলে সংসার চলে না। তারপরও নিজের পরিচয় ফিরে পেতে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে হচ্ছে।"
বাদশার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি নিয়ে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ আলাউল হোসেন তনু বলেন, "বাদশা শেখের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভুলবশত বা যে কারণেই হোক, আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত সংশোধন করে একজন জীবিত মানুষকে তার ভোটাধিকারসহ সব নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিক।"
অবশেষে এই দীর্ঘ বিড়ম্বনার অবসান ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় নির্বাচন অফিস। এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদ জানান, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে বাদশা শেখের পরিচয় সংক্রান্ত জটিলতা ইতিমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে এখন আর বাদশা শেখকে মৃত হিসেবে দেখানো হচ্ছে না, তিনি এখন সরকারি নথিতেও পুরোপুরি 'জীবিত'।