
ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে গানম্যানসহ পার হওয়ার সময় সেনাসদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান জামায়াতের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা–১৭ আসনের প্রার্থী। ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্র বা গানম্যান নিয়ে প্রবেশের বিধিনিষেধের কথা জানানো হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পুরো ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায় তিনি সেনাসদস্যদের বলছেন, বহু বড় বড় অফিসাররা ৫ আগস্টের পর পা ধরেছেন আমাদের কাছে গিয়ে। আমি কিছু বলিনি। আমরা এমন কুকুরের মতো পাচাটা হয়নি।
ঘটনার সময় খালিদুজ্জামান ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করতে চাইলে দায়িত্বরত সেনাসদস্যরা তার পরিচয় জানতে চান। তখন তার সঙ্গে থাকা একজন বলেন, “ভাই উনি হলেন এই আসনের এমপি ক্যান্ডিডেট। ঠিক আছে?”
এ পর্যায়ে এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘বুঝতে পেরেছি স্যার। আমাদের ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে গান নিয়ে...।’
এর জবাবে খালিদুজ্জামান বলেন, ‘আপনারা তো গান নিয়ে বসে আছেন। তারেক জিয়ার(বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান) ক্ষেত্রে তো আপনারা জিহ্বা দিয়ে রাস্তা চেটে ফেলতেছেন। আমরা কেন যেতে পারবো না...।’
সেনা কর্মকর্তা তখন বলেন, ‘স্যার এটা তো আমাকে বললে হবে না...।’
এতে আরও উত্তেজিত হয়ে প্রার্থী বলেন, ‘আপনার পরিকল্পিতভাবে দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছেন । দিজ ইজ টোটালি, কিছু অফিসারের জন্য সেনাবাহিনী বিতর্কিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে আপনারা বিতর্কিত করছেন। প্রয়োজনে আমি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলবো। এখানে যে দায়িত্বে আছেন আপনি তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কেন আমার গাড়ি আটকে রাখবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘না না আপনারা তো আটকে রাখছেন। দিস ইজ নট ফেয়ার। টোটালি সেনাবাহিনী সম্পদ। এই সম্পদকে আপনারা বিতর্কিত করছেন ব্যক্তি স্বার্থে। ব্যক্তি স্বার্থে সরকারকেও আপনারা বিতর্কিত করছেন।’
এ সময় দায়িত্বরত এক সেনাসদস্যকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে ফোন দিতে দেখা যায়। ফোনালাপে ওই প্রার্থীকে বলতে শোনা যায়, ‘ব্যক্তিস্বার্থে সরকার ও প্রশাসনকে আপনারা বিতর্কিত করতেছেন।’
জবাবে সেনাসদস্য বলেন, ‘আমাকে একটু সময় দেন স্যার।’
এরপর খালিদুজ্জামান বলেন, ‘একটা ডিজঅ্যাপোয়েন্টিং সিচুয়েশন করে রেখেছেন সারা দেশে। আপনাদের জন্য তাড়াতাড়ি দেশটা উচ্ছৃঙ্খল হবে। পুরো দেশটা বিশৃঙ্খল করছেন আপনারা।’
ফোনে সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘....একজন জামায়াত পদপ্রার্থী প্রবেশ করে বের হবেন। ওনার সঙ্গে গানম্যান আছেন। আমি অ্যালাউ করলাম স্যার।’
এ সময় প্রার্থী বলেন, ‘তারেক জিয়ার(বিএনপি চেয়ারম্যান) প্রতিদ্বন্দ্বী এস এম খালিদুজ্জামান বলেন। বলেন, তারেক জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী। উনি আমার ক্যান্ডিডেট।’
পরে খালিদুজ্জামান ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে কথা বলতে চান এবং বলেন, ‘আমার সঙ্গে(ঊর্ধ্বতনের) কথা বলিয়ে দেন।’ এরপর তাকে মোবাইল ফোনটি দেওয়া হয়।
ফোনে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা ১৭ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু আপনারাতো তারেক জিয়ার জন্য জিহবা দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। আমাকে কেন দেবেন না? হোয়াই নট। শোনেন। আপনার নাম কী বললেন? পরিকল্পিতভাবে, দেশটার মধ্যে কেওয়াজ সৃষ্টি করছেন আপনারা। কেন আপনারা দেশটাকে ধংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিছু অফিসার নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের ডিস্টার্ব করে, দেশটাকে ধংস করছেন। আমি সেনাপ্রধানের কাছে এটা কমপ্লেইন করতে চাই। আপনাদের অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে চাই। নির্বাচন কমিশন থেকে নিরাপত্তার জন্য দিয়েছে গানম্যান। আবার আপনি আমাকে যেতে দেবেন না কেন?’
কথা শেষে তিনি সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বলেন, ‘তোমরা ভিডিও করো যে, আমাদের গাড়ি যেতে দিচ্ছে না।’ তখন এক সেনাসদস্য জানান, ‘সরি স্যার এখানে ভিডিও করা যাবে না।’
এরপর খালিদুজ্জামান বলেন, ‘আপনারা কেন দেশটাকে ধংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক মানুষ রক্ত দিয়েছে। আর রক্ত নিয়েন না আল্লাহর ওয়াস্তে। সেনাপ্রধান দেশটাকে অত্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে রক্ষা করেছেন ...’
জবাবে সেনাসদস্য বলেন, ‘আমিতো আপনাকে যেতে নিষেধ করিনাই । আপনাকে বলেছি আপনি জাস্ট যান স্যার। কিন্তু আমাদের ক্যান্টনমেন্টে গান নিয়ে, অস্ত্র নিয়ে ঢোকা নিষেধ।’
খালিদুজ্জামান বলেন, ‘তাহলে আমাদের গানম্যান কেন দিচ্ছেন।’
সেনাসদস্য বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্টের জন্য না স্যার। ক্যান্টনমেন্টের জন্য আমরাই নিরাপত্তা দিচ্ছি।’
আরেক সেনাসদস্য যোগ করেন, ‘ক্যান্টনমেন্টে আপনি সেইফ(নিরাপদ)।’
খালিদুজ্জামান বলেন, ‘আমরাতো পার হয়ে যাব বলছি।’
সেনাসদস্য জানান, ‘ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যদি কোনো প্রবলেম হয়ে থাকে, দায় দায়িত্ব ক্যান্টনমেন্ট নেবে।’
প্রার্থী বলেন, ‘পার হয়ে যাওয়ার পর কে দেখবে।’
সেনাসদস্য বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্ট পার হয়ে যাওয়ার পর আপনার গানম্যান থাকবে স্যার।’
এর জবাবে খালিদুজ্জামান বলেন, ‘গানম্যান থাকবে না আপনার দল পিটাবে, আপনারা অন্য দল দিয়ে পিটাইয়া ... আমাদের দেখবে কে।’
সেনাসদস্য বলেন, ‘আমাদের ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আপনি সেইফ।’
খালিদুজ্জামান বলেন, ‘তারেক জিয়ার সঙ্গে হাজার হাজার অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছেন ...’
সেনাসদস্য বলেন, ‘এর জবাব এখন দিতে পারছি না।’
খালিদুজ্জামান প্রশ্ন করেন, ‘কেন পারবেন না।’
সেনাসদস্য বলেন, ‘আপনার যদি কোনো কমপ্লেইন থাকে! আপনিতো বললেন, কথা বলবেন। স্যারকে বলেন।’
আরও বলেন, ‘আপনিই তো বললেন যে, সেনাপ্রধান স্যারের সঙ্গে কথা বলবেন। ইলেকশান কমিশনের সঙ্গে কথা বলবেন।’
পাশ থেকে প্রশ্ন করা হলে সেনাসদস্য জানান, ‘যেতে গেলে আমাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে স্যার।’
এতে খালিদুজ্জামান বলেন, ‘না না সহযোগিতা না। আপনারা পরিকল্পিতভাবে দেশটাকে ধ্বংস করছেন। রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে দেশটাতে কেওয়াজ সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন। একটা এজেন্ট হিসেবে।’
সেনাসদস্য তখন বলেন, ‘আপনি হয়ত জানেন কিনা জানি না। ক্যান্টনমেন্টের এই রুলসগুলো আপনাকে ফলো করতে হবে স্যার।’
প্রার্থীর হাতে থাকা ফোনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি যোগ করেন, ‘স্যার ক্যামেরাটা মনে হয় অন আছে। ক্যামেরাটা অফ রাখতে হবে। কথা বলেন সমস্যা নেই।’
জবাবে খালিদুজ্জামান বলেন, ‘মোবাইল হাতেও রাখা যাবে না! শোনেন, এই সময় বুচ্ছেন সবসময় থাকে না। আপনাদের সময় সবসময় সমান যায় না। বহু বড় বড় অফিসাররা ৫ আগস্টের পর পা ধরেছেন আমাদের কাছে গিয়ে। আমি কিছু বলিনি। আমরা এমন কুকুরের মতো পাচাটা হয়নি। ঠিক আছে?। গোলামীর...। না না আপনারা তো গোলাম হয়ে গেছেন। আপনারা অলরেডি গোলাম হয়ে গেছেন। দেশটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন একটি দলের কাছে। পরিকল্পিতভাবে গোলাম হয়ে গেছেন। আমরা এখন কোথায় কমপ্লেইন করবো বলেন। আস্ত্রছাড়া ওপাশে গিয়ে পিটানি খাবো আমি ।’
এ সময় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘জগন্নাথে যে মারামারি করছে আপনাদের গাড়ির সামনে, ঠেকিয়েছেন?’
সেনাসদস্য উত্তর দেন, ‘স্যার এটা তো আমাদের...বাইরের। এটা তো সিভিলের...’।
শেষে খালিদুজ্জামান বলেন, ‘এখন আমি বাইরে গিয়ে কী করবো। ব্যাক করে দেন। আমি চলে যাই।’
এরপর তিনি গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।