
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক পর্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দেবেন তিনি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পাবে।
এর পাশাপাশি যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটি প্রথম অংশগ্রহণ। ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পরিকল্পনা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। অন্যদিকে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ মর্যাদার বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র সচিব।
সফরসূচি অনুযায়ী, নিউইয়র্কে পৌঁছে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। ওইদিন সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে দেওয়া স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেবেন তিনি। পরে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। পরে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেবেন তিনি।
পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
একই দিন বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এবারের ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের বিষয়ে দেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের উদ্যোগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্টেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় স্থান পাবে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট, মেটাসহ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, উৎপাদন ও অবকাঠামো খাত, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয় গুরুত্ব পাবে।
নিউইয়র্কে কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরে তার সঙ্গে তুলনামূলক ছোট একটি প্রতিনিধিদল থাকছে।
পররাষ্ট্র সচিব আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের যাত্রা বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাসীর কাছে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের বার্তা তুলে ধরাই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।