
ঘন, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত চুল শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং শরীরের সার্বিক সুস্থতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। অনেকেই মনে করেন দামি প্রসাধনী ব্যবহার করলেই চুল ভালো থাকবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত কিছু সাধারণ অভ্যাসই চুলকে দীর্ঘদিন সুস্থ ও সুন্দর রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চুল আঁচড়ানোর কাজকে অনেকেই শুধু জট ছাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেন। কিন্তু নিয়মিত চুল আঁচড়ালে মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা চুলের গোড়াকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং নতুন চুল গজানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া মাথার ত্বকে জমে থাকা অতিরিক্ত তেল, মৃত কোষ এবং প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশও সহজে দূর হয়। ফলে মাথার ত্বক পরিষ্কার থাকে এবং বিভিন্ন ত্বকজনিত সমস্যার ঝুঁকিও কমে।
চুল আঁচড়ানোর সময় অতিরিক্ত টান বা তাড়াহুড়া করলে চুল ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে ভেজা চুল তুলনামূলক বেশি নরম ও সংবেদনশীল থাকে।
তাই বড় ফাঁকযুক্ত চিরুনি বা এমন ব্রাশ ব্যবহার করা ভালো, যা চুলে অপ্রয়োজনীয় টান সৃষ্টি করে না। চুল ধোয়ার আগে হালকা করে আঁচড়ে নিলে জট ও ময়লা সহজেই দূর হয়। আবার পরিচর্যার উপকরণ ব্যবহারের পর ভেজা অবস্থায় ধীরে ধীরে জট ছাড়ালে চুলের ক্ষতি অনেকটাই কমে।
চুল পরিষ্কার করা এবং চুল কোমল রাখা—এই দুই ধরনের উপকরণের কাজ ভিন্ন। তাই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম অনুসরণ করা উচিত।
শ্যাম্পু ব্যবহারের সময় মাথার ত্বককে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আঙুলের নরম অংশ দিয়ে আলতোভাবে মালিশ করলে মাথার ত্বক পরিষ্কার হয়। শ্যাম্পুর ফেনা ধুয়ে যাওয়ার সময় চুলের বাকি অংশও স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়।
অন্যদিকে কন্ডিশনার বা কোমল রাখার উপকরণ সাধারণত চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে আগা পর্যন্ত ব্যবহার করা উচিত। এতে চুল মসৃণ থাকে এবং সহজে জট বাঁধে না।
অনেকের ধারণা, গরম পানি দিয়ে চুল ধুলে বেশি পরিষ্কার হয়। কিন্তু অতিরিক্ত গরম পানি চুলের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে এবং বাইরের সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এর ফলে চুল শুষ্ক, রুক্ষ ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যাদের খুশকি, সংবেদনশীল ত্বক বা মাথার ত্বকে প্রদাহের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।
চুলের জন্য হালকা গরম অথবা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করাই সবচেয়ে উপকারী।
চুল ধোয়ার পর অনেকেই তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে পানি মুছে ফেলেন। কিন্তু ভেজা অবস্থায় চুল সবচেয়ে দুর্বল থাকে। তাই ঘষার পরিবর্তে তোয়ালে বা গামছা দিয়ে হালকাভাবে চেপে অতিরিক্ত পানি শুষে নেওয়া ভালো।
নরম কাপড়ের তোয়ালে ব্যবহার করলে চুলে ঘর্ষণ কম হয় এবং ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
শুধু ত্বক নয়, চুলও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হয়। দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায় এবং চুল রুক্ষ ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে।
এ কারণে বাইরে বের হলে টুপি, ওড়না বা মাথা ঢাকার অন্য কোনো ব্যবস্থা ব্যবহার করলে চুল ও মাথার ত্বক দুটিই সুরক্ষিত থাকে।
চুলের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের ভেতরের পুষ্টির ওপর। তাই শুধু বাহ্যিক পরিচর্যা যথেষ্ট নয়।
চুলের প্রধান উপাদান প্রোটিন হওয়ায় খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, সয়াবিনজাত খাবার এবং দইয়ের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবারও চুলের বৃদ্ধি ও শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। এসব পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিয়মিত খুব শক্ত করে খোঁপা বা পনিটেইল করলে চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে চুল পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চুল বাঁধার জন্য নরম কাপড়ে মোড়ানো ফিতা বা ব্যান্ড ব্যবহার করলে চুলের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।
দিনের পরিচর্যার পাশাপাশি রাতের যত্নও চুলের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে চুল সহজেই ভেঙে যেতে পারে। তাই ঘুমানোর আগে চুল পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়া উচিত।
এছাড়া মসৃণ কাপড়ের বালিশের কভার ব্যবহার করলে চুলে ঘর্ষণ কম হয়, ফলে সকালে চুলে জট কম লাগে এবং ভাঙার পরিমাণও কমে যায়।
নিয়মিত এসব ছোট ছোট অভ্যাস মেনে চললে অতিরিক্ত প্রসাধনীর ওপর নির্ভর না করেও চুলকে দীর্ঘদিন সুস্থ, ঘন ও উজ্জ্বল রাখা সম্ভব।