
ইরানের শীর্ষ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এখনো বেঁচে আছেন এবং অন্তরাল থেকে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর সাহায্যে ক্রমশ তৎপরতা বাড়িয়ে চলেছেন বলে বড় তথ্য প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের সামনে দেওয়া বক্তৃতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই দাবি করেন। তিনি জানান, চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর কখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, "আমরা তাকে (মোজতবা খামেনি) জনসমক্ষে দেখিনি। ওই শাসনব্যবস্থার (ইরান) একাধিক নেতার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা বিবেচনা করলে সম্ভবত তাদের নিজেদের পক্ষ থেকেই এখন জনসমক্ষে আসাটা নিরাপদ মনে করা হচ্ছে না। তবে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, তিনি একটি নির্দিষ্ট স্তরে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছেন। যদিও তার সব যোগাযোগ এ পর্যন্ত লিখিতভাবে ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হচ্ছে।"
রুবিও আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নির্ধারণের সমস্ত বিষয় চরমভাবে কেন্দ্রীভূত রূপ নিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্ত থাকা আলোচকদের যেকোনো ধরণের বার্তা বা প্রস্তাব চূড়ান্ত সম্মতির জন্য প্রথমে একটি উচ্চপর্যায়ের পরিচালনা পর্ষদের কাছে পাঠাতে হয়। সেখান থেকে গ্রিন সিগন্যাল মেলার পরেই কেবল প্রত্যুত্তর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, "আমাদের বোঝাপড়া অনুযায়ী এ শাসনব্যবস্থার রূপটি এমন, যা মধ্যস্থতাকারী ও ইরান সরাসরি আমাদের কাছে প্রকাশ করেছে। আব্বাস আরাগচি ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আমাদের কাছ থেকে যা-ই আদান-প্রদান করুন না কেন, তা অনুমোদনের জন্য তাদের ওই কাউন্সিলের কাছে ছুটে যেতে হয়। চূড়ান্তভাবে তাদের কাছ থেকেই নির্দেশনা নিতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় একটি জবাব আসতে প্রায়ই তিন থেকে পাঁচ দিন লেগে যায়।"
অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও তেহরানের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলমান রয়েছে বলে দাবি করলেও ইরানি গণমাধ্যমের সুর ভিন্ন। গতকাল ইরানের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার পরোক্ষ বার্তা বিনিময় প্রক্রিয়া গত কয়েক দিন ধরে সম্পূর্ণ স্থগিত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল, তাকে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি থেকে স্থায়ী শান্তিবুক্তিতে রূপ দিতে নেপথ্যে কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণেই রুবিও এই মন্তব্য করলেন।
ইরান সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির ৩ হাজারেরও বেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। অন্য দিকে, এর জবাবে ইরানের পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৩ জন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে তেহরানও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের নিশানা করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেয় ইরান।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের জোরালো মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সক্ষম হয় পক্ষগুলো। তবে এরপর ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক শান্তি আলোচনাগুলো কোনো স্থায়ী চুক্তির মুখ দেখতে পারেনি। অবশ্য অচলাবস্থা কাটানোর এবং সংকট সমাধানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো পর্দার আড়ালে জারি রয়েছে।