
নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ কমবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের বিস্তার ঘটলে ব্যবসা পরিচালনার খরচও কমে আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত ‘লঞ্চিং অব ডায়নামিক বাংলা কিউআর ফর ইউনিভার্সাল পেনশন স্কিম, পাওয়ার্ড বাই ট্রাস্ট ব্যাংক’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ডিজিটাল অর্থনীতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে।’
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে ডিজিটালাইজেশন এবং ক্যাশলেস লেনদেনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
অর্থমন্ত্রীর মতে, নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি আরও কার্যকর হবে। এর ফলে অর্থনীতির স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমে আসবে।
বাংলা কিউআরে আন্তঃসংযোগ
বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর ও গতিশীল একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর ও গতিশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আন্তঃসংযোগ বা ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করা। বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মধ্যে আন্তঃসংযোগ না থাকলে বাংলা কিউআরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’
অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যাংক এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত না করা গেলে বাংলা কিউআরের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
লেনদেনের তথ্য কাজে লাগবে কর আদায় ও নীতিনির্ধারণে
ডিজিটাল লেনদেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধার কথাও তুলে ধরেন আমির খসরু।
তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের একটি তথ্যভিত্তিক রেকর্ড তৈরি হবে। এর ফলে কর আদায় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ট্র্যাক করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের তথ্য সংগ্রহ করে নীতিনির্ধারণেও তা ব্যবহার করা যাবে।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যভিত্তিক রেকর্ড থাকায় কর আদায়ের কার্যক্রম সহজে অনুসরণ করা যাবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
করদাতাদের ওপর অযৌক্তিক চাপ কমানোর সুযোগ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কিছু ব্যবসায়ী বা করদাতার ওপর বারবার করের চাপ বাড়ানো হয়। ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে কর প্রশাসনে আরও স্বচ্ছতা আসবে এবং করদাতাদের ওপর অযৌক্তিক চাপ কমানো সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তার মতে, কার্যকর ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকলে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়বে। পাশাপাশি একই ব্যবসায়ী বা করদাতার ওপর বারবার অযৌক্তিক করের চাপ দেওয়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দপ্তরে না গিয়েও মিলবে সেবা
ডিজিটাল সেবা বিস্তারের ফলে সরকারি ও আর্থিক সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসবে বলে মন্তব্য করেন আমির খসরু।
তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল সেবা বিস্তৃত হলে মানুষকে সেবা নিতে বারবার শারীরিকভাবে বিভিন্ন দপ্তরে যেতে হবে না। বাসায় বসেই অনেক ধরনের সরকারি ও আর্থিক সেবা পাওয়া সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যত বেশি সম্ভব ফিজিক্যাল কন্টাক্টের বাইরে নিয়ে আসতে হবে।’
অর্থাৎ ডিজিটাল সেবা বাড়লে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবা নিতে বারবার দপ্তরে গিয়ে শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হবে না। ঘরে বসেই অনেক সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
অটোমেশনে কমবে ব্যবসা পরিচালনার খরচ
ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অটোমেশন ব্যবহারের ওপরও জোর দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অটোমেশন বাড়ানো গেলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কমবে। বন্দর থেকে বিমানবন্দর—অর্থনীতির প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অটোমেশন নিয়ে আসতে হবে।
তার মতে, এর ফলে দেশের ব্যবসা ও সেবাকে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এআই ব্যবহারে সক্ষমতা তৈরির তাগিদ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে এগিয়ে যেতে হলে এআই ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এআইকে অর্থনীতি ও ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করা না গেলে বাংলাদেশের পক্ষে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।’
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য, ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। অর্থনীতি ও ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সবশেষে ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর আদায়ের সক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা যাবে।’