
টানা কয়েক সপ্তাহের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আর ম্যারাথন বৈঠকের পর অবশেষে কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভি ডি সাতিসানের নাম চূড়ান্ত করেছে কংগ্রেস। এর মাধ্যমে গত ১০ দিন ধরে চলা দলীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল। কংগ্রেস হাইকমান্ডের এই সিদ্ধান্তের ফলে দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর একাধিক যোগ্য প্রার্থীর উপস্থিতিতে কেরালার নেতৃত্ব নির্ধারণ করা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই দৌড়ে সাতিসানের পাশাপাশি কংগ্রেস এমপি কেসি ভেনুগোপাল এবং বর্ষীয়ান নেতা রমেশ চেন্নিথালার নামও জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় কংগ্রেস পর্যবেক্ষক মুকুল ওয়াসনিক এবং অজয় মাকেন স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদদের মতামত গ্রহণ করে রাহুল গান্ধীকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী স্বয়ং সাতিসান ও কেরালার জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে আলোচনার পর এই চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। এর আগে কেরালা কংগ্রেস লেজিসলেচার পার্টি (সিএলপি) এক প্রস্তাবের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সর্বময় ক্ষমতা হাইকমান্ডের ওপর অর্পণ করেছিল।
ছাত্র রাজনীতি থেকে মুখ্যমন্ত্রী: সাতিসানের উত্থান
৬১ বছর বয়সি ভি ডি সাতিসানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এক চমৎকার বৃত্ত পূরণের গল্প। এরনাকুলাম জেলার নেত্তুরে জন্ম নেওয়া এই নেতা ছাত্রজীবনেই থেভারার সেক্রেড হার্ট কলেজে রাজনীতিতে হাতেখড়ি দেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী ইউনিভার্সিটি ইউনিয়ন এবং এনএসইউআই-এর মতো সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে হারলেও, ২০০১ সাল থেকে পারাভুর আসনটি তাঁর দখলে রয়েছে। এবারের নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, দল ক্ষমতায় না ফিরলে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন। তবে জোটের অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে এখন রাজ্যের শীর্ষ পদে আসীন করল।
নির্বাচনি সমীকরণ ও এলডিএফ-এর পতন
এবারের নির্বাচনে কেরালায় দীর্ঘ এক দশকের বাম শাসনের (এলডিএফ) অবসান ঘটিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। ১৪০ আসনের বিধানসভায় ১০২টি বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছে ইউডিএফ। এর মধ্যে এককভাবে কংগ্রেসের ঝুলিতে গেছে ৬৩টি আসন এবং সহযোগী দল ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল) পেয়েছে ২২টি আসন।
অন্যদিকে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন ব্যক্তিগতভাবে নিজের আসনটি রক্ষা করতে পারলেও তাঁর জোট মাত্র ৩৫টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে (সিপিআইএম ২৬ ও সিপিআই ৮)। এবারের নির্বাচনে ৩টি আসন জিতে রাজ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি)। সাতিসানের ‘টিম ইউডিএফ’ স্লোগান এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অবস্থানই জোটের এই বিপুল বিজয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
সাতিসানের দক্ষ সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ ইমেজ কেরালার রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা আনবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল।