
পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর দৃশ্যের সাক্ষী হলো কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে এবার সরাসরি আইনজীবীর কালো কোট পরে আদালতের এজলাসে হাজির হলেন। ভোট পরবর্তী সহিংসতা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে আইনি লড়াইয়ের ময়দানে নামলেন তৃণমূল নেত্রী।
কালীঘাট থেকে আদালত: এক নতুন যাত্রা
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে কালীঘাটের বাসভবন থেকেই পেশাদার আইনজীবীর পোশাকে বের হতে দেখা যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সকাল দশটার কিছু পর তিনি কলকাতা হাইকোর্টের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ সময় পর তাঁকে আইনজীবীর পোশাকে দেখে আদালত চত্বরে উপস্থিত আইনজীবী, সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়। তবে ভিড় এড়িয়ে তিনি কোনো মন্তব্য না করে সরাসরি প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে চলে যান।
মামলার প্রেক্ষাপট ও মূল অভিযোগ
বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, নেতা-কর্মীদের ওপর আক্রমণ এবং বহু সমর্থকের ঘরছাড়া হওয়ার অভিযোগ তুলে একটি মামলা দায়ের করা হয়। রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে এই মামলায়। উল্লেখ্য, এই মামলাটি দায়ের করেছেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র এবং উত্তরপাড়া কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। মূলত এই মামলাতেই দলীয় কর্মীদের সপক্ষে সওয়াল করতে হাজির হয়েছেন মমতা।
আইনি লড়াইয়ের নেপথ্যে রাজনৈতিক বার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার এই আদালতে উপস্থিতি কেবল একটি মামলার শুনানি নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে বলে দাবি করে আসছে। ভবানীপুর কেন্দ্রে পরাজিত হওয়ায় বর্তমানে মমতা বিধায়ক পদে নেই, তবে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি এবার তিনি আইনের আঙিনাকেই প্রতিবাদের প্রধান মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
আইনজীবী হিসেবে বৈধতা
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদালতে সওয়াল করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। কারণ, কর্মজীবনের শুরুতে তিনি আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তাঁর আইনজীবী হওয়ার বৈধ অনুমতি এখনো বজায় রয়েছে। সেই পুরনো পেশাদার পরিচয়কেই তিনি এবার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন।
প্রতীকী লড়াইয়ের ইঙ্গিত
আদালত চত্বরে মমতার এই উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বিরোধী নেত্রী হিসেবে তিনি এখন আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও কৌশলী ভূমিকা পালন করবেন। কালো কোট পরে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেমন আইনি ভিত্তি সম্পন্ন, তেমনি এটি একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তাও বটে—যে ক্ষমতা হারালেও তিনি তাঁর অনুসারীদের সুরক্ষায় যেকোনো স্তরের লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। ভোট পরবর্তী পরিস্থিতির এই জটিল সমীকরণ এখন রাজপথ ছাড়িয়ে সরাসরি আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে ঠেকেছে।