
নাগরিক সেবা ও কর প্রদানের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। করদাতাদের আস্থা ফেরাতে এখন থেকে প্রতিটি কর রসিদে উল্লেখ থাকবে ওই অর্থের কত শতাংশ জনকল্যাণমূলক কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (০৭ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই নতুন পরিকল্পনার কথা জানান।
কর-সেবার বিনিময়ে সামাজিক আস্থার সংকট
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে আয়োজিত এক প্রাক-বজেট গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. তিতুমীর রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ওপর জোর দেন। আইসিএবি ও দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের যৌথ আয়োজনে তিনি বলেন, নাগরিক তখনই কর দিতে উৎসাহিত হবেন যখন তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে এর সুফল পাবেন। তার মতে, “নাগরিক তখনই কর দিতে আগ্রহী হবে, যখন সে বুঝতে পারবে করের বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে সেবা দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি কমবে না।”
আগামী বাজেট থেকেই নতুন রসিদ ব্যবস্থা
সরকার আশা করছে, আগামী অর্থবছর থেকেই করদাতাদের বিশেষ রসিদ প্রদান করা হবে। সেখানে স্পষ্ট করা হবে যে, তার দেওয়া করের অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় কতটুকু অবদান রাখছে। ড. তিতুমীর জানান, সরকার করের হার না বাড়িয়ে বরং অর্থনীতির পরিধি বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহের দিকে মনোযোগী। প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে তিনি সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন।
কর ফাঁকির রাজনৈতিক শেকড় ও সংস্কার
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ হওয়াকে ‘বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার’ হিসেবে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। এই রুগ্ন দশার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, “গোষ্ঠীতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় রাখবে, আর বিনিময়ে কর খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। কর ফাঁকি ও জালিয়াতির মূল শেকড় এখানেই।”
এই সংকট উত্তরণে তিনি ‘বিযুক্তি’ (ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে করদাতা ও কর্মকর্তার যোগাযোগ হ্রাস) এবং ‘সংযুক্তি’ (ব্যয়ের হিসাব জানানো) সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্স ও সৃজনশীল অর্থনীতি
অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূল ধারায় আনা, বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করা এবং এসএমই নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
উপদেষ্টা আরও জানান, গেম নির্মাতা, ডিজাইনার ও ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেন যারা
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান, অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মবিন এবং দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ।