
উত্তরবঙ্গের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গতি আনতে গঠিত ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ঋণে সুদের হার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-১ থেকে এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করা হয়। এতে তহবিলের ঋণের মেয়াদ, সুদহার, পরিশোধ পদ্ধতি এবং প্রচার-প্রচারণাসহ কয়েকটি শর্ত সংশোধন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার এ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। গত ৬ জুলাই এ তহবিলের মূল নীতিমালা জারি হয়েছিল।
গ্রাহক পর্যায়ে সুদ সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ
সংশোধিত নির্দেশনায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়যোগ্য সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ রাখা হয়েছে। সব গ্রাহকের ক্ষেত্রেই এ সীমা সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নে শরিয়াহ অনুমোদিত বিনিয়োগ নীতিমালা অনুসারে মুনাফার হার নির্ধারণ করতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই তা ৭ শতাংশের বেশি নেওয়া যাবে না। ঋণ বা বিনিয়োগের কিস্তিতে ক্রমহ্রাসমান স্থিতির ভিত্তিতে সুদ বা মুনাফা আরোপ করতে হবে।
ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩৬ মাস
সংশোধিত নীতিমালায় ঋণ বা বিনিয়োগের মেয়াদেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন খাতে সংশ্লিষ্ট খাত বা প্রকল্প বিবেচনায় তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৮ মাসের জন্য ঋণ বা বিনিয়োগ দেওয়া যাবে।
অন্যদিকে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিজাত ও কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতে তিন থেকে ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ৩৬ মাস বা তিন বছর।
পুনঃঅর্থায়ন নেওয়ার তারিখ থেকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১৮ মাস বা ৩৬ মাসের মধ্যে মূল অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ৩ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হবে।
অনিয়মে আর্থিক শাস্তি
তহবিলের অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে সংশোধিত নির্দেশনায় কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে তহবিলের অর্থ বা এর কোনো অংশ অপব্যবহার করা হয়েছে, অথবা বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে ৭ শতাংশের বেশি সুদ বা মুনাফা নেওয়া হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অর্থের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে এককালীন সুদ বা মুনাফা আদায় করা হবে।
অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার বেশি সুদ বা মুনাফা আদায় কিংবা তহবিলের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে আর্থিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
সুবিধা প্রচারে ব্যাংককে ব্যানার দিতে হবে
তহবিলের সুবিধা প্রকৃত উদ্যোক্তা ও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রচার-প্রচারণার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ তহবিলের আওতায় ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় ঋণ বিতরণ কিংবা বিনিয়োগের তথ্য ব্যাংক শাখার ভেতরে ও বাইরে সহজে চোখে পড়ে—এমন স্থানে ব্যানার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে রেয়াতি ঋণের সুবিধা সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে।
উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে গতি আনার লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল নীতিমালা অনুযায়ী, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোকে কেন্দ্র করে এ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী এলাকা হলেও উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষির পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণে সহজ শর্তে অর্থায়ন দেওয়াই তহবিলটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ তহবিলের আওতায় কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন, বাজারজাতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিজাত ও কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্য ও কৃষিভিত্তিক পণ্য রপ্তানির মতো কার্যক্রমে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।
সুদের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনায় উত্তরবঙ্গের কৃষক, উদ্যোক্তা ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায়ীদের তুলনামূলক কম খরচে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়লে কৃষিপণ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যে মূল্য সংযোজনের সুযোগ বাড়বে।
একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষির সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যের সংযোগ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সংশোধিত নির্দেশনার অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকবে এবং সার্কুলারটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
পরের হেডলাইন আরও ছোট নাকি আরও ক্লিকযোগ্য রাখব?