
পাবনার ঈশ্বরদীকে ঘিরে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঈশ্বরদী ইপিজেড এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি কৃষি ও শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর মতো পর্যটন খাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—ঈশ্বরদী বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা—যেন বারবার উপেক্ষার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
গত ২৩ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল এই দাবিটি জোরালোভাবে তুলে ধরে বলেছেন, “ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমানবিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এখন মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। সেখানে নিয়মিত দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা যাতায়াত করছেন। এখানে একটি বিমান বন্দরও রয়েছে। অথচ বিমান বন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। আমি ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালুর বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।”
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বিমানবন্দরটি আবার সচল করার বিষয়ে ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা; বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সংক্রান্ত কোনো অফিশিয়াল বা লিখিত নির্দেশনা এখনও তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৬২ সালে ৪৩৬ দশমিক ৬৫ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিমানবন্দরটি, যার রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৭০০ ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। দীর্ঘ সময় সচল থাকার পর ১৯৯০ সালের ৫ এপ্রিল এটি প্রথম দফায় বন্ধ হয়ে যায়। চার বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে ১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই পুনরায় বিমান উড্ডয়ন শুরু হলেও দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর আবারও তা বন্ধ করা হয়।
এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরের বিরতি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি ৩৭ আসনের ফ্লাইটের মাধ্যমে ঢাকা-ঈশ্বরদী-ঢাকা রুটে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হয়। শনি ও সোমবারের সেই ফ্লাইটের ওয়ান-ওয়ে ভাড়া ছিল ৪ হাজার এবং রিটার্ন ভাড়া ছিল ৮ হাজার টাকা। তবে যাত্রীস্বল্পতা ও আর্থিক লোকসানের অজুহাতে মাত্র ছয় মাসের মাথায় ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল আবারও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বাণিজ্যিক ফ্লাইট।
বাণিজ্যিক উড্ডয়ন বন্ধ থাকলেও কারিগরি দিক থেকে বিমানবন্দরটি পুরোপুরি মৃত নয়। বর্তমানে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এর নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। রানওয়ে, অ্যাপ্রন ও ট্যাক্সিওয়েও এখনও পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য রয়েছে। তবে মোট জমির একটি বড় অংশ (২৯০ দশমিক ৭৪ একর) মিলিটারি ফার্মের কাছে হস্তান্তর করায় এখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অধীনে রয়েছে কেবল ১৪৫ দশমিক ৯১ একর জমি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানকার এক কর্মী জানান, বাণিজ্যিক বিমান না চললেও সামরিক বাহিনী এবং রূপপুর প্রকল্পের রুশ বিজ্ঞানীদের বহনকারী হেলিকপ্টার এখানে নিয়মিত ওঠানামা করে। তবে যাত্রীবাহী বড় বিমান নামাতে হলে বর্তমান রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে অন্তত ৬ হাজার ফুট করা জরুরি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা বিমানবন্দরটি চালুর বিষয়ে বরাবরই সোচ্চার। এ প্রসঙ্গে ঈশ্বরদীর খায়রুল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আলহাজ খায়রুল ইসলাম বলেন, “ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ঈশ্বরদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। এ গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই ১৯৬২ সালে বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। লোকসানের অজুহাতে এটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা দ্রুত বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর দাবি জানাই।”
একই সুর শোনা গেল ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আশিকুর রহমান নান্নুর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডের কারণে ঈশ্বরদীতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। তাদের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের স্বার্থে বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন তৈরিতে এই বিমানবন্দরটি চালুর কোনো বিকল্প নেই। তবে পুনরায় চালুর পর এটি যেন আবার বন্ধ না হয়, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।