
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা কাঠামো পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। একইসঙ্গে আগামী ২৭ জুনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সারাদেশের গ্রাহকদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২৪ জুন) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক নুর-উন নবী মানিক।
সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের নেতারা জানান, গত ১ জুন থেকে তারা সাত দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এ সময় মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আনা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এতদিনেও দাবিগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তারা মনে করেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আরও বিলম্ব হলে ইসলামী ব্যাংকের বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ সামনে আসার পরও ব্যাংকটির জন্য গ্রহণযোগ্য, দক্ষ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অংশীজন ও গ্রাহক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সৎ, যোগ্য এবং স্বাধীন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের আহ্বান জানান তারা।
ফোরামের নেতারা দাবি করেন, তাদের সংগঠন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয়। বরং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকটিতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা কাজ করছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় ইসলামী ব্যাংকে জমা রেখেছেন এবং অনেকেই আমানতের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হলে সাধারণ গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তারা আরও বলেন, ব্যাংক মালিকদের সংগঠন, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকেও দ্রুত পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে নিতে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয় প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইসঙ্গে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ও আমদানি ব্যয় পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন, প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, ব্যাংক লুটের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বন্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, এস আলম গ্রুপের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণ অনিয়ম তদন্তে বিদ্যমান আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবিও জানানো হয়।
ফোরামের নেতারা ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮/ক ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলেন, বর্তমান আইনি কাঠামো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বানও জানান তারা।
বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, আস্থা ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই ব্যাংকটির স্বার্থে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সংগঠনটি ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ২৭ জুনের মধ্যে দাবিগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সারাদেশের গ্রাহকদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হবে। এছাড়া ২৮ জুন সকাল ১১টায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।