
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর মৃত্যুর পর পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত।
বৃহস্পতিবার (০৫ মার্চ) নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ করেন ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী।
সেখানে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান এবং দূতাবাসে রাখা শোকপুস্তিকায় স্বাক্ষর করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদসংস্থা এএনআই এই তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই সাক্ষাতের ছবি ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে।
গত কয়েক দিন ধরে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গত শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থানে সামরিক হামলা শুরু করে। সেই হামলার মধ্যেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি।
রোববার তেহরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর থেকেই পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে এটি একটি বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা।
খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একই সঙ্গে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ শুরু করে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরিন, সৌদি আরব এবং কুয়েত–এর আকাশসীমায় ইরানের ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এতে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
এই অস্থিরতার মধ্যে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ, একদিকে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গেও দিল্লির ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় আছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ে ভারত কী ধরনের অবস্থান নেবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছিল।
এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে ইরান দূতাবাসে বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রীর উপস্থিতিকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকজ্ঞাপন করেন এবং শোকপুস্তিকায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারত সরকারের সমবেদনা জানান। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকী হলেও এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—বিশেষ করে যখন পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক নেতার সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তিনি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। দিল্লি বারবার জানিয়েছে, যে কোনো সংকটের সমাধানে আলোচনার পথই সবচেয়ে কার্যকর।
তবে খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের অবস্থান নিয়ে দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দেয়। বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর বিষয়ে ভারত সরকার কেন প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না। এমন বিতর্কের মধ্যেই বিদেশ সচিবের এই পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য হিন্দু এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে দিল্লি অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখছে। একই সঙ্গে ভারত এই সংঘাতে সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে শান্তির পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে চায় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ভারতমুখী একটি ইরানি জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় ধ্বংস হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবু ঘটনাটি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং খুব দ্রুত যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা নেই। তার এই বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত যে অত্যন্ত সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে তা স্পষ্ট। একদিকে শান্তির পক্ষে অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের প্রতি সহমর্মিতা—বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই দিক সামলে চলাই এখন ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের মূল লক্ষ্য।