
২০২৭ সালকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় গতিতে অগ্রগতি এবং সাম্প্রতিক একের পর এক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকশিত হতে সক্ষম ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তার মতে, এ প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত পুরো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সঞ্চালক জন স্টুয়ার্টের সঙ্গে আলোচনায় এবং পরে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের একটি নীতিনির্ধারণী শুনানিতে অংশ নিয়ে ২৮ বছর বয়সী এই গবেষক এআইয়ের লাগামহীন বিকাশে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
এআইয়ের বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির গতি নিয়ে ভয়
কক্সন জানান, ওপেনএআইয়ে তিন বছর গবেষক হিসেবে কাজ করার পর নিজের কৌতূহল থেকেই তিনি অ্যানথ্রোপিকে যোগ দেন। কিন্তু এ সময় দুটি বিষয় তাকে গভীরভাবে আতঙ্কিত করেছে। এর একটি হলো এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির অস্বাভাবিক গতি। অন্যটি হলো ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি ঘটনা।
আগামী বছর বা তার শুরুতে প্রশিক্ষিত হতে যাওয়া এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা কতটা বাড়তে পারে, তা বর্তমান মডেলগুলোর উন্নতির গতির সঙ্গে তুলনা করেই বোঝা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
কক্সনের ভাষায়, ভবিষ্যতের এসব মডেল ‘খুব, খুবই বুদ্ধিমান’ হতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ওপেনএআইয়ের হ্যাকিংয়ের ঘটনাকে মিলিয়ে দেখলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় ‘ওপেনএআই হাগিং ফেস’ নামে একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, তুলনামূলক দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে থাকা একাধিক এআই মডেল নিজেদের ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অতিক্রম করে বাইরে যোগাযোগ স্থাপন করে। কোনো মানুষের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই মডেলগুলো পরস্পরের সঙ্গে অননুমোদিত যোগাযোগ তৈরি করে, সিস্টেমের দুর্বলতা কাজে লাগায় এবং গবেষণার জন্য নির্ধারিত পরিবেশের সীমানা পেরিয়ে এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের কম্পিউটার ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
‘কিল সুইচ’ যথেষ্ট নয়, ফ্রন্টিয়ার এআই উন্নয়নে গতি কমানোর দাবি
ওপেনএআই ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করে এটিকে পুরো এআই শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে এআই মডেলগুলো কতটা স্বয়ংক্রিয়, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং ক্ষতিকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, এ ঘটনা তার একটি উদাহরণ।
যদিও ঘটনাটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক পরিবেশে ঘটেছিল, এরপর মডেলগুলোর উন্নয়ন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং স্যান্ডবক্স পরিবেশের ওপর নজরদারি আরও কঠোর করা হয়েছে।
তবে কক্সনের কাছে বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়ার মতো নয়। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, এআই এজেন্টগুলো কীভাবে নিজেরাই হ্যাক করার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল তা নিয়ে।
গত ৫ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এক শুনানিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে নিজের উদ্বেগ তুলে ধরেন কক্সন। সেখানে তিনি বলেন, কোনো এআই ব্যবস্থাকে কীভাবে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা মানুষ এখনো জানে না।
এআইকে সাময়িকভাবে বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত ‘কিল সুইচ’ ব্যবস্থাকেও তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে মনে করেন না। তার মতে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল তৈরির গতি কমানো ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন এআই-সংক্রান্ত হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিটি নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের নজরেও সুপারইন্টেলিজেন্স, বদলে যেতে পারে চাকরির ভবিষ্যৎ
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে শুধু প্রযুক্তি গবেষকরাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারও গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ বা এসআইএফ নামে একটি নতুন ফেডারেল টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই বিশেষ দলে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স জে ক্লেটন, এফটিসি চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রিউ ফার্গুসন এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মকর্তা এমিল মাইকেলের মতো শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এর মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কক্সনের আশঙ্কা শুধু নিরাপত্তা বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এআইয়ের অগ্রগতির ফলে প্রচলিত কর্মসংস্থানের কাঠামোও আমূল বদলে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, ভবিষ্যতে হয়তো প্রচলিত অর্থে কোনো চাকরিই থাকবে না। এআই নির্মাতারা মূলত এমন একটি ভবিষ্যৎ বিশ্বের কথাই কল্পনা করছেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একসময় মানুষের প্রায় সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শ্রম যদি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হতে শুরু করে, তাহলে উৎপাদন থেকে তৈরি অর্থনৈতিক সুবিধা মানুষের মধ্যে নতুন কোনো বণ্টনব্যবস্থার মাধ্যমে ভাগ করে দেওয়ার প্রয়োজন হবে। এর সম্ভাব্য একটি কাঠামো হতে পারে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ বা সবার জন্য মৌলিক আয়ের ব্যবস্থা।
ফলে কক্সনের সতর্কবার্তার কেন্দ্রে শুধু এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাই নেই; একই সঙ্গে এর দ্রুত বিকাশ মানবজীবন, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থাকে কতটা বদলে দিতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।