
আর্জেন্টিনা ৩–২ মিসর। শেষ বাঁশি বাজল যোগ করা সময়ের ১২তম মিনিটে। অসম্ভবকে সম্ভব করে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও যে দল ফিরে আসে, সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন একজনই। লিওনেল মেসি। শেষ বাঁশির পর দুই হাত মুখে চেপে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রু। যেন শুধু একটি ম্যাচ নয়, কোটি সমর্থকের বিশ্বাসও নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করলেন ফুটবলের জাদুকর।
মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই বিশ্বকাপ ছেড়ে বিদায় নিয়েছে নেইমারের ব্রাজিল। তার আগের রাতে শেষ হয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের স্বপ্ন। টানা দুই রাতে ফুটবল হারিয়েছে দুই মহাতারকাকে। তাই বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে মঙ্গলবার রাতের প্রার্থনা ছিল একটাই-‘আজ যেন মেসির বিদায় না হয়।’ শেষ পর্যন্ত সেই প্রার্থনারই যেন উত্তর মিলল আটলান্টার রাতে। মেসি রইলেন, বেঁচে রইল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি।
কিন্তু শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো।
১৫ মিনিটেই ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় মিসর। এরপর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালালেও সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। নিকোলাস তালিয়াফিকো ফাউল আদায় করে পেনাল্টি এনে দিলেন। স্পটকিকে দাঁড়ালেন মেসি। পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। কিন্তু শোবেইর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দিলেন সেই শট। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল আর্জেন্টিনার গ্যালারি।
সেখানেই শেষ নয়।
ম্যাক অ্যালিস্টারের নিশ্চিত গোল, হুলিয়ান আলভারেজের দুর্দান্ত প্রচেষ্টা-সবই ফিরিয়ে দিলেন মিসরের গোলরক্ষক। মনে হচ্ছিল, ভাগ্যও যেন আজ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও বড় ধাক্কা। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে মোহাম্মদ সালাহর পাস থেকে জিজো বল জড়িয়ে দেন জালে। স্কোরলাইন ২–০। আটলান্টা তখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটির সাক্ষী হতে প্রস্তুত।
কিন্তু যাদের দলে মেসি থাকেন, তাদের গল্প শেষ বাঁশির আগে শেষ হয় না।
৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো প্রথম আলো জ্বালান। সেই আক্রমণ গড়ে ওঠার পেছনেও ছিল মেসির বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা। গোলের পর বল কুড়িয়ে দ্রুত সেন্টার সার্কেলের দিকে দৌড়ে যান তিনি। চোখেমুখে একটাই বার্তা-এখনও সময় আছে।
তারপর শুরু হয় জাদু।
৮৪ মিনিটে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করেননি মেসি। নিখুঁত ফিনিশে বল পাঠিয়ে দেন জালে। পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো উল্লাসে। গোল উদ্যাপনের বদলে সতীর্থদের নিয়ে আবারও দ্রুত মাঝমাঠে ফিরে গেলেন তিনি। কারণ তখনও জয়ের গোল বাকি।
যোগ করা সময়ে যখন ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, তখনও থামেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। প্রতিটি আক্রমণের সূচনা, প্রতিটি প্রেসিং, প্রতিটি পাসে তিনি যেন দলকে সামনে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে ৯০+২ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের পায়ে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। কয়েক মিনিট আগেও যে দল বিদায়ের কিনারায় ছিল, সেই দলই মুহূর্তে উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।
স্কোরশিটে মেসির নামের পাশে একটি গোল। কিন্তু ম্যাচের গল্পটা সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়।
পেনাল্টি মিস করার পরও ভেঙে পড়েননি তিনি। সতীর্থদের সাহস জুগিয়েছেন। মাঝমাঠে নেমে বল বিলিয়েছেন। আক্রমণ সাজিয়েছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রেখেছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারাতে দেননি কাউকে। একজন অধিনায়ক কীভাবে পুরো দলের মানসিকতা বদলে দিতে পারেন, তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে রইল এই ম্যাচ।
শেষ বাঁশির পর তাই চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি মেসি। সেই অশ্রু ছিল স্বস্তির, লড়াইয়ের, বিশ্বাসের। হয়তো নিজের জন্যও, হয়তো কোটি সমর্থকের জন্যও।
আটলান্টার রাতটি তাই শুধু আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গল্প নয়। এটি এমন এক জাদুকরের গল্প, যিনি বারবার প্রমাণ করেন-ফুটবল কেবল পায়ে খেলা হয় না, খেলা হয় বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাসের নাম যদি হয় লিওনেল মেসি, তাহলে দুই গোল পিছিয়ে থাকাও শেষ কথা নয়।