
বাংলাদেশের ক্রিকেটে জমে থাকা হতাশা যেন আবারও প্রকাশ্যে। এক শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের অসহায় কণ্ঠে শোনা গেল, ‘দয়া করে ক্রিকেটকে বাঁচান, এর বেশি আর কিছু বলার নেই।’ এই মন্তব্যই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে পুনরায় ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে খেলোয়াড়দের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। বোর্ডের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক ক্রিকেটার নিজেদের পুরোপুরি অসহায় মনে করছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে টানা প্রতিবাদের মুখে নাজমুল ইসলামকে ওই পদ থেকে সরানো হয়েছিল। বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে গত ১৪ জানুয়ারি দেওয়া তার এক মন্তব্য থেকে। সেদিন তিনি বলেছিলেন, আসন্ন আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ব্যর্থ হলে ক্রিকেটারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো দায় বোর্ডের নেই। তার বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খারাপ খেললেও বোর্ড যেমন খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা ফেরত চায় না, তেমনি বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ না হলেও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন ওঠে না।
নাজমুলের পুনর্বহালের খবর শুনে এক ক্রিকেটার ব্যঙ্গ করে বলেন, 'এটা তো খুবই ভালো খবর।' সঙ্গে সঙ্গে তিনি যোগ করেন, 'এতেই তো বোঝা যায় এখানে সবকিছু কীভাবে হচ্ছে।' এই প্রতিক্রিয়াই বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেটারদের গভীর অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়।
নাজমুলের মন্তব্যের প্রতিবাদে একসময় ক্রিকেটাররা সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর প্রভাব পড়ে সদ্যসমাপ্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও, যা একদিনের জন্য স্থগিত ছিল। পরে ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তারা মাঠে ফেরেন। তখন তাদের দাবি ছিল নাজমুলের প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং পরিচালনা পর্ষদ সংক্রান্ত বিষয়ে বোর্ডের দেওয়া প্রতিশ্রুত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। বোর্ড থেকে তাকে পুরোপুরি অপসারণের দাবিও তখন আর তোলা হয়নি।
তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। নাজমুলের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এমনকি বিসিবির শোকজ নোটিশের জবাবও তিনি নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন পর দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় নাজমুল ইসলাম পরিচালকদের সমর্থন পেয়েছেন। সেখানেই তাকে আবার ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, শৃঙ্খলা কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণ বোর্ডে জমা দিয়েছে এবং 'সভাপতির নির্দেশেই তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।'
এই সিদ্ধান্তে হতাশা লুকাননি ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কেয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন। বিস্তারিত মন্তব্যে না গেলেও তিনি ক্রিকেটারদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। রোববার মিঠুন বলেন, 'আমরা আমাদের দাবি প্রকাশ্যে জানিয়েছি, বোর্ডও প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাহলে কে প্রতিশ্রুতি রাখছে না, সেটা পরিষ্কার। দায়িত্বও তাদেরই, যারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না।'
নাজমুল ইসলামের পুনর্বহাল প্রসঙ্গে বিসিবির মিডিয়া কমিটির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যেই আরেকটি বড় ধাক্কা এসেছে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে। ভারতের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের জন্য বিসিবির আবেদন আইসিসি প্রত্যাখ্যান করায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলা নিশ্চিত হয়েছে। এসব ঘটনার সমষ্টিতে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন খেলাটির মূল অংশীজন, অর্থাৎ ক্রিকেটাররাই।