
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে একটি সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়কে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। এ নিয়ে অধিবেশন চলাকালে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় নেতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকারের অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
পুরো অধিবেশনজুড়ে বিষয়টি ঘিরে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদীয় নীতি এবং রাজনৈতিক কৌশলসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় ও তর্ক-বিতর্ক হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলা অধিবেশনেই বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে এ বাকযুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
গাজী নজরুলকে কমিটিতে রাখার ব্যাখ্যা চিফ হুইপের
আলোচনার শুরুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি ও অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সেসব কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে যতক্ষণ গাজী নজরুলের সদস্যপদ বহাল রয়েছে, ততক্ষণ সংসদের কার্যক্রমে প্রত্যেক সদস্যকে সম্পৃক্ত করা এবং তাঁদের অবদান রাখার সুযোগ করে দেওয়া স্পিকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল বা সরকারি দলের বাইরের কোনো কমিটিতে গাজী নজরুলকে রাখা সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি কমিটি থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এ অবস্থায় অন্য কোনো উপযুক্ত কমিটি না থাকায় তাকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যে কমিটি হয়তো বছরে এক বা দুইবার বৈঠক করে।
তবে এ সিদ্ধান্তে বিরোধী দলের আপত্তি থাকলে গাজী নজরুলের নাম বাদ দিতে সরকারি দলের কোনো দ্বিধা নেই বলেও জানান চিফ হুইপ।
‘নৈতিক কারণে’ কমিটিতে না রাখার দাবি বিরোধীদলীয় নেতার
চিফ হুইপের বক্তব্য শেষ হলে মাইক হাতে নেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁদের কোটার অংশ হিসেবে ওই কমিটিতে দেওয়া হয়নি—এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা স্পষ্ট করেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে গাজী নজরুলকে কমিটির জন্য প্রস্তাব করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নৈতিক কারণে যেহেতু তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাই জাতীয় সংসদের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তাকে কোনো কমিটিতে না রাখাই সঙ্গত ও নৈতিক সিদ্ধান্ত হতো।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু সিদ্ধান্তটি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে, তাই গাজী নজরুলকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হলে সেটিই একটি ভালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ
এরপর স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি গাজী নজরুলের সদস্যপদ নিয়ে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কেও পরামর্শ দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী শুধু কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরাসরি প্রযোজ্য হয় না, যদি না সংশ্লিষ্ট সদস্য নিজে পদত্যাগ করেন।
তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম যেহেতু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন, তাই বিরোধী দল চাইলে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি সামনে এনে স্পিকার বা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিতে পারে। এর ফলে তাঁর আসন শূন্য হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের আপত্তির বিষয়টি বিবেচনা করে এবং তাদের নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে গাজী নজরুল ইসলামকে সংশ্লিষ্ট কমিটি থেকে বাদ দিতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতার রসিকতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে কিছুটা হাস্যরসের সুরে প্রতিক্রিয়া জানান বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, দুর্বল মানুষকে জব্দ করার জন্য গ্রামে যেমন মেম্বার নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার কথা প্রচলিত রয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মাঝে মাঝে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে এ ধরনের কিছু টিপস দেন।
তবে গাজী নজরুলের বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থানও পরিষ্কার করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, যাকে দল থেকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে, তিনি দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ফ্লোর ক্রসিং করেছেন—এ বিষয়টি নতুন করে দাবি করার কোনো সুযোগ তাঁদের নেই।
তিনি আরও বলেন, নৈতিক অবস্থান থেকে গাজী নজরুলকে কমিটিতে না রাখার যে আবেদন তাঁরা জানিয়েছেন, সেটি বিবেচনায় নেওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।
এরপর আবার ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান থেকে বিষয়টি স্পষ্ট—তারা গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চান, কিন্তু তাঁকে কোনো কমিটিতে রাখতে চান না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুনরায় বলেন, সংবিধানের আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলাম এখনো বৈধ সংসদ সদস্য। বিরোধী দল যদি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে।
তবে বিরোধীদলীয় নেতার সম্মানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামকে প্রস্তাবিত কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
নতুন করে কমিটি গঠনের প্রস্তাব চিফ হুইপের
বিতর্ক ও আলোচনার শেষ পর্যায়ে আবারও দাঁড়ান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। সব সংসদ সদস্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতার ইচ্ছা ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংশোধনসহ ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি’ পুনর্গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৪৫ বিধির আওতায় তিনি গাজী নজরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটির সদস্যদের নাম পাঠ করেন।