
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন।
২০২৪ সালের সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার (৫ আগস্ট) দিল্লিতে প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনের অডিওবার্তায় তিনি বলেন, তাকে নিজ দেশে ‘ফিরতেই হবে’। তবে কবে বা কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা তারিখ প্রকাশ করতে চান না বলে জানান।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ছিল ১৫ বছরেরও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রথম আনুষ্ঠানিক মতবিনিময়। তিনি অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে বক্তব্য দেন এবং পরে সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
জাতিসংঘের তদন্তকারীদের দাবি, ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনা ও তার সরকার পরিকল্পিত প্রাণঘাতী সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল।
এদিকে, বিবিসি আই যাচাই করা একটি ফোনালাপের অডিওতে শেখ হাসিনাকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের অনুমোদন দিতে শোনা গেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ এবং দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে ওই অডিও রেকর্ডিংকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন প্রসিকিউটররা।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।
প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ঢাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর হাজার হাজার বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করে।
এর পরবর্তী সময়ে ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং দলটির নেতা তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
নতুন সরকার এরই মধ্যে স্থানীয় গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ বা সম্প্রচার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
দেশ ছাড়ার পরপরই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগের নেতাদের অভিযোগ, গণপিটুনি ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় তাদের শত শত সমর্থক নিহত হয়েছেন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতেও আরও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থানরত শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসিকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা যদি ফিরে না যান, তাহলে সহিংসতা চলতেই থাকবে এবং তারা আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে।’
দলের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, অনেক শীর্ষ নেতা দেশ ছেড়ে গেলেও মধ্যম সারির নেতা ও সমর্থকদের সম্ভাব্য হামলার মুখে রেখে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা যদি ঢাকায় ফেরেন, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ঢাকাভিত্তিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের মতে, ব্যক্তিগতভাবে এটি তার জন্য অত্যন্ত বড় ঝুঁকি। তিনি বাংলাদেশে ফিরলে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার হবেন।
ডেভিড বার্গম্যান আরও বলেন, সম্ভবত আওয়ামী লীগের উপলব্ধি হয়েছে যে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার কোনো প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে হলে তাকে দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হয়তো সে কারণেই বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনায় অটল রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।